কেন বিজেপি’র NRC ও CAA আইন এর প্রতিবাদ করা দরকার?

১। জন্ম নিবন্ধন, জাতিয় পরিচয়পত্র ও নাগরিকত্ব সনদপত্র ইত্যাদি সেবা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু দশকের পর দশক এসব বিষয়ে ভারত সরকার কোন মনোযোগ দেয়নি। ফলে কারো সব কাগজপত্র আছে, কারো কোন কোনটি আছে, কারো কিছুই নেই, ২০১৪ সালের আগেও নেই, পরেও নেই। ফলে হুট করে NRC আর CAA আইন হওয়ায় আসাম, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অনেক নাগরিক যারা ৪৭, ৭১ এমনকি এর আগেও গেছেন, তারাও পরে গেছে ঝামেলায়। মোদী সরকার বিষয়টিতে কড়াকড়ি পদক্ষেপ নেয়ায় প্রায় ৪০ লক্ষ ভারতীয় এরকম ঝামেলায় পরেছেন। এর মধ্যে সেনা কর্মকর্তা , ব্যাংকার, শিক্ষকসহ অনেক প্রতিষ্ঠিত বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকও রয়েছেন। গতবছর সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়া একজন আসামের নাগরিক, যার বাবা বাংলাদেশ থেকে আসামে গিয়েছিলেন ৪৭ এর পরপর, আত্মহত্যা করেছেন। কেননা তাঁর নাগরিক সনদপত্র ছিলনা, তার এতকাল প্রয়োজনও পরেনি। অথচ তাকে NRC এর আওতায়, তার নাগরিকত্ব নেই বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল অফিশিয়ালি। বাংলাদেশ এর নাম ছাড়া পিতৃভূমির আর কোন চিহ্নই যার জীবনে ছিলনা, যিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় আর পরিশ্রম দিয়েছেন ভারতকে মাতৃভূমি হিসেবে, তাঁর পক্ষে এই আইন চূড়ান্ত অবাস্তব ও অকল্পনীয়। শুধু তিনি একা নন, আসামে NRC আইনের কড়াল গ্রাসে আত্মহত্যাকারীর সংখ্যা প্রায় ডজন ছাড়িয়েছে।

২। CAA আইনে কোন ধর্মের উল্লেখ না করে শুধু “নির্যাতিত” বা “সংখ্যালঘু” কিংবা “প্রান্তিক” শব্দ উল্লেখ করা উচিৎ ছিল। কোন ধর্মের নাম উল্লেখ করা এবং “মুসলিম” ধর্মীয়দের বাদ দেয়া এবং আইনের বিস্তারিত অংশে নির্যাতক হিসেবে উল্লেখ করা অত্যন্ত বর্ণবাদী আচরণ। এটা অমানবিক ও বিতর্কিত। মোদী সরকার এই আইন বানিয়েছে বলেই এটার চেহারা এরকম হয়েছে। কোন ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার ক্ষমতায় থাকলে আইনের ধরণ ও ভাষা এরকম হতনা, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

৩। CAA ও NRC এর মধ্যে তাই যখন কোন মুসলিম ব্যক্তি পরে যাবেন, তখন তিনি যথাযথ কাগজপত্র যদি না দেখাতে পারেন, সেক্ষেত্রে তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাবে। এরকম মুসলিম বৈধ/অবৈধ নাগরিকের সংখ্যা কিন্তু কম না, সংখ্যাটা কোটি কোটি। যেকারণে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনেকেই রয়েছেন যারা রাস্তায় নেমেছেন, প্রতিবাদে ফেটে পরছেন। এতে মানবাধিকার হারাবেন তারা এবং রাষ্ট্রহীন হয়ে যাবেন।

৪। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ মোদী/বিজেপির হাতের বাইরে ছিল এবং আছে মোটামুটি সব সময়। বাম ও তৃণমূলের বাইরে এই রাজ্যদ্বয়ে কোন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসার কল্পনাও করতে পারেনা এখন আর। মূলত ব্রিটিশ আমলের আগে পরে এবং ৭১ এর আগে ও পরে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শরণার্থীর স্রোত এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এরা সবসময়ই বাম ও তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক। ফলে বিজেপি এই ভোট ব্যাংককে কনভিন্স না করতে পেরে, উল্টো সুরক্ষা দেবার নামে কৌশলে ধবংস করার একটি উপায় বের করার উদ্দেশ্যে এই আইন তৈরি করেছে। এতে শুধু মুসলিমরা নয়, এন আর সি আইনের আওতায় বাদ পরবে অনেক হিন্দু যারা খুব সাম্প্রতিক সময়ে গেছেন এবং সব কাগজপত্র তৈরি করার সুযোগ পাননি।

ভারতে যাওয়া মনে হয় আমাদের দেশের মানুষ, সে হিন্দু হোক, মুসলমান হোক, যে ই হোক, এক সময় খুব সহজ ছিল। বছর ত্রিশেক আগেতো কাটাতারই ছিল না সব জায়গায়। মানুষ আকছার নানা কারণে ভারতে যেত অবৈধভাবে সীমান্ত পেড়িয়ে। এদেশের মূল স্রোতের মানুষের পাসপোর্ট দেখিয়ে ভারত যাওয়ার চর্চা শুরু হয়েছে বেশিদিন হয়নি। খুব বেশি দিন না মাত্র বছর দশেক আগেও, ফেলানী হত্যার আগ পর্যন্ত তখনও কাঁটাতারে এত কড়াকড়ি শুরু হয়নি, রাতের আঁধারে পিঁপড়ের সারির মত প্রতিদিনই বাংলাদেশীরা অবৈধভাবে ঢুকত ভারতে। সীমান্তবর্তী এলাকায় যাদের আবাস, তাদের কাছে এটা ছিল পরিচিত দৃশ্য এবং ওপেন সিক্রেট। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও হিন্দুরা নিরাপত্তা হীনতায় ভুগেছে, কেউ কেউ বেকারত্বের কারণেও কাছের দেশে দেশান্তরী হয়েছে ভাগ্যান্বেষণে। এসব মানুষরাই এখন বিপদে পরে যাবে মূলত। গুজরাটসহ যেসব প্রত্যন্ত এলাকায় বাংলাদেশী (হিন্দু/মুসলিম)আছে তাদের বিপদের দিন ঘনিয়ে আসছে। এরাও যুক্ত হয়ে যাবে নিশ্চিত এ আন্দোলনে। প্রশাসন তাদের উপর কঠোরতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করবে নিঃসন্দেহে।

মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী এই আইন বানিয়ে ভারতকেকে হিন্দুত্ববাদী দেশ বানাতে মরিয়া বিজেপি। মোদী সরকারের অবশ্য ধর্ম, যুদ্ধ আর তথাকথিত উন্নয়ন ছাড়া আর কোন ইস্যুও নেই রাজনীতি করার।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL