কোন বিষয় নিয়ে পড়বেন: ভালো লাগার বিষয় নাকি যে বিষয়ে চাকরির বাজার ভালো?

এই চরম প্রতিযোগিতার যুগে কেরিয়ারে সফল হতে হলে কিছু কৌশল যেমন আয়ত্ব করতে হবে তেমনি দৃষ্টিভঙ্গিতেও যথেষ্ট পরিবর্তন আনতে হবে, বিশেষত শিক্ষার্থীর বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের। কারণ আমাদের দেশের বাবা-মা বা অভিভাবকরাই আসলে এখনও নির্ধারণ করেন সন্তান কোন বিষয়ে পড়বে। ছোটবেলা থেকে নিজেদের স্বপ্নটা একরকম চাপিয়ে দেন সন্তানের কাঁধে। আবার অনেক সময় শুধু চাকরির বাজার ভালো যে বিষয়ের, সেই বিষয়ে পড়াশোনা করতেই সন্তানকে বাধ্য করেন কিংবা উৎসাহিত করেন। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেন না, আসলে যে পড়বে, তার কি পছন্দ।

শ্রাবণের সাইকোলোজি বা মনোবিজ্ঞান পছন্দের একটি বিষয়। কিন্তু তার বাবা-মা চান সে সাধারণ চিকিৎসক হোক যেহেতু এতে সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা সহজে নিশ্চিত হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে সে মেডিকেল কলেজে পরীক্ষা দিল এবং টিকেও গেল। তার স্বপ্নের মৃত্যু হল।

অনন্যা ভালবাসে সাহিত্য পড়তে কিন্তু তার অভিভাবকরা চান সে যেন কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে চান্স পেয়ে সেটাই পড়ে। তাই তাকে প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে সে অনুযায়ী। নয়ন তার আগ্রহের জায়গা থেকে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চান, কিন্তু তার অভিভাবকরা চান সে বুয়েটের কোনো বিষয়ে পড়ুক।

অনেকে মনে করেন নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়াশোনা করাটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অবাস্তব এবং ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রত্যাশিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব আয়ের মিল নেই। কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়, কিন্তু আসলেই কতটা অবাস্তব সে বিষয়ে ভাবার সময় এসেছে আমাদের। আসুন দেখি কেন আমরা আবার নতুন করে ভাবব বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে-

  • এখন দেখা যায়, চাকরির বাজার ভালো যে বিষয়ে সেই বিষয়ে পড়াশোনা করেও চরম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তার মানে দামি বিষয়ের সার্টিফিকেট থাকা মানেই চাকরি পাওয়া সহজ নয়।
  • বিষয়ের প্রতি ভালবাসার ঘাটতি প্রভাব ফেলে চাকরি জীবনেও। ফলে দক্ষতা উচ্চ মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হয় না দক্ষতা হয় গড়পড়তা এবং বেতন বা আয়ও হয় শেষ পর্যন্ত গড়পড়তাই।
  • ব্যক্তিজীবনে পেশাজীবনের নেতিবাচক অভিজ্ঞতার প্রভাব পরে খুব সহজে অনেক বাজে অভ্যাস তৈরি হতে পারে। যেমন- অনিদ্রা, অ্যালকোহল গ্রহণ, নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে সবকিছু বিচার করা ইত্যাদি।‌
  • অল্প বয়সেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন হাইপার টেনশন, কোলেস্টরল, চর্বি, হাই প্রেশার, মানসিক জটিলতা ইত্যাদি।

 

এবার আসুন যদি পছন্দের বিষয়ে কেউ পড়বে এই সংকল্প করে ঝুঁকি নিয়ে বসে সে কেন সফল হবে-

  • যে বিষয়ে আপনি প্যাশন বা আগ্রহ অনুভব করেন সেই বিষয়ে পড়লে সফল হবার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বেড়ে যাবে, কারণ আর কিছুই নয়, বিষয়টি আপনার ভালো লাগে। মানুষ তার ভালো লাগার পিছনে তার সব জীবন ব্যয় করতে পারে।
  • পরিশ্রম করে ভালো ফলাফল করতে পারলে এবং শিক্ষাজীবনেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ক পার্ট-টাইম কাজে যুক্ত থাকতে পারলে উচ্চ মাত্রার দক্ষতা অর্জিত হবে এবং অভিজ্ঞতাও অর্জিত হবে যা চাকরি পেতে খুব সহায়তা করবে। যেমন- অনিমা বাংলা সাহিত্য খুব পছন্দ করত কিন্তু তার অভিভাবক চাইত সে বিজ্ঞানের কোনো বিষয় নিয়ে পড়ুক। সে সবার অমতেই একরকম বাংলায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। শিক্ষা জীবনের ২য় বর্ষ থেকেই সে পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করে। মাস্টার্স শেষে সে একটি পত্রিকায় ফিচার সম্পাদক হিসেবে যোগ দেয়। বেতন ভালো। অন্য বিষয়ে পড়াশোনা করেও হয়তো সে এর চেয়ে একটু বেশি বা কম বেতনে চাকরি পেত, কিন্তু সে চাকরিতে তার এত ভালবাসা ও সন্তুষ্টি থাকত না। এছাড়া তার জন্য আরও অনেক চাকরি পাবার সুযোগ ছিল- শিক্ষকতা, ভাষা তত্ত্বাবধায়ক হওয়া, বিসিএস ক্যাডার হওয়া ইত্যাদি।
  • কর্মস্থলে যতই চাপ থাকুক তা মোকাবেলা করা সহজ হবে।
  • পেশাগত জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে ব্যক্তি জীবনে তার প্রভাব পরবে না।
  • গবেষণায় মনোনিবেশ করা সম্ভব।
  • শরীর ও মন প্রফুল্ল থাকবে এবং আইকিউ লেভেল অনেক বয়স পর্যন্ত ভালো থাকবে।

 

 

মোটকথা, পছন্দের বিষয়ে মনোনিবেশ, পরিশ্রম করে ভালো ফলাফল করতে পারলে চাকরি পাওয়া নিয়েও এখন আর কোনো ভয় নেই। বাংলাদেশের মতো দেশও এখন কর্মীর বিশেষায়ীত কর্মদক্ষতার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাই পছন্দের বিষয় নির্বাচনে এখন আর ভয় না থাকাটাই কাম্য। থ্রি ইডিয়টস চলচ্চিত্রটি আমরা অনেকেই হয়তো দেখেছি, জীবনের সাফল্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সময় এসেছে। পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়ে সংশ্লিষ্ট কাজে অতিদক্ষ হলে অর্থ আর সাফল্যই আপনার পিছনেই ছুটবে, আপনাকে আর চাকরি ও অর্থের পেছনে ছুটতে হবে না।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL