‘রাং দে বাসান্তি’র রঙ

আজ একটা খবরে দেখলাম নেপালের সেই ইউ এস বাংলার বিমান দূর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট বের হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বিমান চালক হতাশ, বিসন্ন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিতে না পেরে তাড়াহুরায় বিমান দূর্ঘটনা ঘটে। পুরো দোষ বিমান চালকের। এই রিপোর্ট দেখে মনে হল, এটা রাং দে বাসন্তি’র অজয় সিং রাঠোর কেস নয়তো! সস্তা জ্বালানি আমদানি করে সেসব বিমান কোম্পানিতে সাপ্লাই করে কোটি কোটি টাকা বাণিজ্য আর এক একটা দূর্ঘটনা ঘটার পর লোক দেখানো তদন্ত। এদেশে এটা অস্বাভাবিক কিছু না।

এনিওয়ে, সবকিছু নিয়ে এত হতাশ একটু অন্য কথা বলি, যখনই আমি কোন আশা পাইনা দেশ নিয়ে, তখন এই ছবিটা দেখি। মানুষ ইন্ডিয়া যায় ঘুরতে। আমি যেতে চাই সিনেমা হলে গিয়ে হিন্দি সিনেমা দেখতে। এরকম ইচ্ছা হয়েছিল রাং দে বাসান্তি সিনেমাটা দেখার পর। কি দারুণ স্টোরি লাইন, সবার অসাধারণ অভিনয়, রক্তে আগুন ধরানো মিউজিক, এরিয়াল ভিউ, ঝকঝকে মন জুড়ানো সিনেমাটোগ্রাফি, এতসব জিনিস বড় পর্দায় দেখেই সুখ।

এই চলচিত্রটার মুক্তির প্রায় এক যুগ হতে চলল। তবু মনে হয়, এইতো সেদিন প্রথম দেখলাম। ১২ বছরে নূন্যতম ১২ বার দেখেছি। মুগ্ধতা থেকেই যায়। আমির খান লোকটা একটা জিনিয়াসের ডিব্বা। না, তার একার কৃতিত্ব নয়। ভাল পরিচালক আর ভাল অভিনেতা সব যুগেই থাকে। ভাল পরিচালকের ভাল ভাল ছবি বের হলেও ২০০১ সালের আগে বাংলা-হিন্দি সব ভাষার চলচিত্রের ক্ষেত্রেই দেখেছি দর্শকের একাংশ সেটা দেখতো, তাও সিনেমা হলে গিয়ে দেখে আসার কষ্ট স্বীকার করত না। একটা ভাল সিনেমা বের হলে ইন্টারনেট বা পাড়ার মোড়ের সিডির দোকানই ছিল ভরসা। কিন্তু আমির খানের মত জনপ্রিয় ধারার নায়ক যখন স্ক্রিপ্ট সিলেকশনের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক হন, তখন সেই বিপ্লব ছড়িয়ে পরে সবখানে।

১৯৯৪ সালে ‘আর্থ’ দিয়ে শুরু। ২০০১ সালের লগান থেকে সেই বিপ্লব সফলতা পেল। এর পর তার অভিনীত প্রতিটি সিনেমাই যুগ সৃষ্টিকারী। দিল চাহতা হায়, থ্রি ইডিয়ট, তেরে জামিন পার, রাং দে বাসান্তি, পিকে, দাংগাল এবং সর্বশেষ সিক্রেট সুপার স্টার। তবে এখন শুধু রাং দে বাসান্তির কথাই বলতে চাই। ফিল্ম ফেয়ার, আইফা এবং দুই দুইটা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডসহ প্রায় ডজনখানেক অ্যাওয়ার্ড পাওয়া এই ছবির Impact অনেক গভীর। আমার মত মামুলি দর্শকই শুধু নয়, পুরো ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এই ছবি। একজন সৃজনশীল মানুষ বা শিল্পীর জীবনের চরম লক্ষ্য থাকে বড় প্রভাব তৈরি করা, মানুষের চেতনায় কিংবা সমাজে। এই ছবির সার্থকতাটা এখানে। আমরা সমাজ বদলানোর কথা বলি, সিনেমায়। কিন্তু লিটারেলি সেটা খুব কঠিন যদি সততা আর দক্ষতায় ঘাটতি থাকে। ২০০৬ সালে ৯২৭ মিলিয়ন ব্যবসা করা এই মুভিটি একটি অটোবায়োগ্রাফি বেসড ছবি। টানা ৭ বছর শুধু স্ক্রিপ্ট লিখতেই খরচ করেছেন পরিচালক ও স্ক্রিপ্ট রাইটার রাকেশ মেহরা। টানা ৭ বছর শুধু একটি বিষয় নিয়ে সিনেমা জগতে কাজ করার বদ হিম্মত এদেশের কারো নেই। আফসোস!

এই ছবিটির মাধ্যমে ভারতের তরুণ প্রজন্ম প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। তারা সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছিল। এই ছবি মুক্তির পর দিল্লীতে খুন হওয়া তরুণী জেসিকার বিচার চাইতে তরুণরা রাস্তায় নেমেছিল মোমবাতি হাতে প্রথম, যা এই ছবিতে দেখানো হয়েছিল। পরে জেসিকা খুনের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয় ‘নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা’।এ ধরনের গন জোয়ার এবং প্রতিবাদী চেতনা ভারতে প্রথম বারের মত ধর্ষণের মত ঘটনার Capital Punishment বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান আদায়ে অনেক সহায়ক ছিল। দিল্লীর মেডিকেল ছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনার বিচারে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে প্রভাবিত করেছে মানুষের এই প্রতিবাদী চেতনা।

এই সিনেমার ইমপ্যাক্ট নিয়ে আরও অনেক অনেক কথা লেখা হয়েছে এযাবৎ। তৈরি হয়েছে একটি তথ্যচিত্রও। তথ্যচিত্রটির নাম ‘রু-বা-রু’। আপাতত কিছু লিংক দিলাম। কেউ বিস্তারিত পড়তে চাইলে পড়তে পারেন:

https://indianexpress.com/…/rubaru-revisits-making-impact-…/

https://www.news18.com/…/10-years-of-rang-de-basanti-8-inte…

http://www.rediff.com/movies/2006/may/30raja.htm

https://pennameofreality.wordpress.com/…/deep-impact-rang-…/

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL