মুক্ত বাতায়ন, খোলা হাওয়া ও আমরা

ধরুন, আপনার একটি দখিনমুখী ঘর আছে । ঘরে নিশ্চয়ই জানালা-দরজা থাকবে। থাকাই স্বাভাবিক। দরজা সবসময় খোলা থাকে না, থাকা উচিতও না। নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তার জন্য। জানালাও যে সবসময় খোলা থাকবে তা নয়। তবে বেশিরভাগ সময়ই রাখতে হয় খোলা। ঘরে বাতাস এবং অক্সিজেন সরবরাহের জন্য কিংবা নিছকই মন ভাল রাখার জন্য। এখন যদি কেউ বলে আপনাকে দরজা ও জানালা সবসময় বন্ধ রাখতে হবে কিংবা নিরাপত্তা বা গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে জানালাটিকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয় তখন আপনি কী করবেন? জানালাটি যদি বন্ধ করে দেন, ধূলা বন্ধ হবে, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তাও থাকবে। সবই ঠিক আছে। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন, এসবের পাশাপাশি অক্সিজেন আর আলো আসাও বন্ধ হবে।

আরেকটু কষ্ট করে ভাবুন, আমাদের দেশ এবং সমাজ কিংবা প্রতিটি ব্যক্তিই হল এই ঘরের মত। আসলে যা কিছু নিতান্ত প্রয়োজন তাকে কিন্তু ঘরে ঢুকতে দিতেই হবে। দখিনা বাতাসের সাথে যেমন আলো ও বাতাস আসে তেমনি ধুলাও আসবে। তাকে আমরা ঠেকিয়ে রাখতে পারব না, কিন্তু আমরা নিজেরা পরিশ্রম করে ঘরটিকে ধূলামুক্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে পারি চাইলেই। সবকিছুই আমাদের মন মানসিকতা এবং পরিশ্রম করবার সক্ষমতার উপর নির্ভর করছে। ইন্টারনেটে কোটি কোটি তথ্য থাকে। যে কেউ চাইলে পর্ন ফিল্ম দেখতে পারে, আবার চাইলেই ভাল ফিল্মও দেখতে পারে, যার যার রুচির উপর নির্ভর করে সবকিছু। সরকার বা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সেই রুচিটা গড়ে দেয়া শিক্ষা ব্যাবস্থা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় রীতি নীতি, নৈতিক মূল্যবোধ চর্চা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে। কোন নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট বন্ধ করে নয়। কোন মানুষ চাইলে নিজের মত প্রকাশ করতেই পারে, কয়জনকে ঠেকাতে পারবে সরকার? তার মুখ বন্ধ করে দেয়া কোন সমাধান নয় দীর্ঘ মেয়াদে। নারী স্বাধীনতা পেলে সে কী করবে সেই আশংকায় যদি আমরা নারীকে বন্দী করে রেখে দেই ঘরে তাহলে নারীর সব খারাপত্বের সাথে সব ভালত্ব ও নষ্ট হয়ে যাবে। এ মহাদেশের নারীরা এমনিতেই হাজার বছর ধরে বন্দী, কেউ কেউ যখনই একটু আধটু দরজার বাইরে এসে মুখ তুলে আকাশ দেখল কী দেখল না, অমনি শুরু হয়ে গেল শংকার ডংকা ধ্বনি, ধর্ম আর হাজার বছরের পুরুষতন্ত্রের দুয়োধ্বনি। তাই ধর্ম আর তথাকথিত পুরুষতন্ত্রের বেড়াজাল ভাঙা এত সোজা নয়। অনেক সমাজ, দেশ, ব্যক্তি তাই ধূলার ভয়ে আলো আর অক্সিজেন বন্ধ করে মানসিক আত্মহননের পথ বেছে নিতে দ্বিধা করে না। সাগর পাড়ি দিতে হলে জলে গা নামাতেই হয়, সে অত্মাধুনিক জাহাজেই হোক, আর ডিঙি নৌকাতেই হোক। স্বাধীনতা হল সাগরের মত। নীল আকাশের মত। তার সুস্বাদ পেতে হলে তাকে অতিক্রম করতে হয়। এই অতিক্রম করার সময় আসে কত ঝড়-কত ঝঞ্জা! স্বাধীনতার অপব্যবহার, অপব্যয়, বন্দীত্ব হল সেই সব ঝড়ের মত। এগুলো মোকাবেলা করে সাফল্যের সাথে তবেই না আসে স্বাধীনতা! তাই বলি, আসুন আমরা জানালা বন্ধ না করে খুলে দেই। ধুলোকে ভয় না পেয়ে আলো আর মুক্তো বাতাসকেই নাহয় আলিঙ্গন করি। ধূলা ঝাড়া কী খুব ই কঠিন?

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL