পারিবারিক নির্যাতন বন্ধে নতুন আইন ও সাধারণের চোখে ব্যাখ্যা

বাংলাদেশে পারিবারিক নির্যাতন বন্ধে নতুন আইন আসছে। যদিও এটা নিয়ে বেশ ঘোলাটে ধারণা ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। আসুন দেখি কী কী নীতিমালা নেয়া হয়েছে, কোন স্বামী যদি নিম্নোক্ত কাজগুলো ক্রিমিনাল অফেন্স হিসাবে গণ্য হবে।

-স্ত্রীকে গালাগালী, বা এমন ভাষা ব্যাবহার করা যা মর্যাদা হানিকর

ব্যাখ্যা: আমরা যা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাই সেটাকেই আসলে স্বাভাবিক বলে ধরে নেই। ধরুন আমি কিংবা আপনি সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি নিজেদের ঘরে একজন মা ভোর থেকে কী কী কাজ করেন। কোন একটি ভোরে তিনি না উঠলে আমাদের খাবার এবং নিয়মিত কাজে ব্যাঘাত ঘটবে বা চলবেই না। এই যে নিজের শরীর, মন এর সব ইচ্ছা অনিচ্ছা ত্যাগ করে বাবাসহ আমাদের খাওয়ানোর জন্য উঠে পড়েন অথচ এর বিনিময়ে নিজ স্বামী এবং সন্তানের কাছ থেকে কী পান তিনি? একটু পান থেকে চুন খসলেই নরম কিংবা গরম ঝাড়ি। তার মানে পারিশ্রমিক (মা বা স্ত্রীর ব্যাপারে পারিশ্রমিকের কথা চিন্তাই করতে পারি না আমরা, যদিও ভারতে স্ত্রীকে ফুলটাইম বেতনের সমতুল্য পারিশ্রমিক দেবার আইন চালু হয়েছে সম্প্রতি) তো নেই ই, মর্যাদাও নেই।

– স্ত্রীকে ঘরের বাইরে যেতে না দেওয়া

ব্যাখ্যা: নিজের বাবা মা ছেড়ে আসে একজন নারী। তাই তাকে আপন করে নেয়ার দায়িত্ব ছেলে এবং তার পরিবারেরই কিন্তু। অথচ ঠিক উল্টো চিত্রই আমরা দেখে আসছি সাধারণত। নিজের পরিবার ছেড়েছুড়ে এসে নতুন একটি পরিবারকে আপন করে নেয়ার যে দায়িত্ব এবং চাপ সেটা মেয়ে না হলে বোঝা যায় না। যদি কেউ বাবার বাড়ি, ভাইয়ের বাড়ি কিংবা নিতান্ত বেড়াতেও যেতে চায়, কিংবা কোন কাজে তখন তাকে না যেতে দেয়া নিতান্তই অযৌক্তিক। অনেক পুরুষ আবার গায়ে ও হাত তোলে, শশুর শাশুড়ি ও মানসিক শারীরীক নির্যাতন করে।

-প্রয়োজনীয় অর্থ না প্রদান করা

ব্যাখ্যা: একজন স্বামী যেমন তারীর স্ত্রীর উপার্জনের হকদার তেমনি স্ত্রীও তার স্বামীর উপার্জনের হকদার। তাছাড়া স্ত্রী যদি গৃহিনী হয়, অবশ্যই তাকে তার হাত খরচের জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে। তার ও স্বাধীনতা এবং অধিকার আছে টাকা খরচ করার। তাকে সে স্বাধীনতা উপভোগ করতে দিতে হবে। ভারতে স্ত্রীকে ফুলটাইম বেতনের সমতুল্য পারিশ্রমিক দেবার আইন চালু হয়েছে সম্প্রতি। আমরা সেটা করতে না পারি, অন্তত তাকে নিতান্ত প্রয়জনীয়টুকু তো দিতে পারি।

-বন্ধু বান্ধবের সাথে কথা বলতে না দেয়া

বাখ্যাঃ: আমাদের সমাজে ধরে নেয়া হত, খেয়াল করুন ‘হত’ বলছি যদিও এখনো ধরে নেয়া হয়, যে নারীর ছেলে বন্ধু থাকতেই পারেনা। বিয়ের পরে তো অবশ্যই নয়। এটাকে আবার ধর্মীয় মাজেজাও দেয়া হয়। এখানে আবার নারীই নারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কী হাস্যকর আমাদের এই দেশ-সমাজ! ধরেই নেয়া হয় নারীর বিয়ের পরে বন্ধু মানেই পরকিয়া। নারী যখন চার দেয়ালে বন্দী তখন এই অজুহাত মানা যায় যে নারীর আবার বন্ধু কী! কিন্তু, নারী যখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হচ্ছে, নারী যখন কর্মস্থলে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে, তার সহকর্মী যখন পুরুষ, শিক্ষক, সহপাঠি যখন পুরুষ তখন তার নারী বান্ধবীদের মত পুরুষ বন্ধু থাকবে সেটাও স্বাভাবিকই যেমন থাকে বা থাকতে পারে পুরুষদের । এটা মেনে নেবার উদারতা থাকতে হবে। নারী-পুরুষ মানেই যে শুধু প্রেম করবে এমন হতে পারে না।স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু-দোস্ত, কিংবা নিছকই ভাল বন্ধুদের সাথে যে স্বামী তার স্ত্রীকে এই জমানায় এসে কথা বলতে দিতে চায়না, সে সামাজিকভাবে সুস্থ নয়। আর পরকীয়া বা ধর্মীয় দোহাই দেয়া আরেক ধরণের অসুস্থতা। তবে পরকীয়া ঘটলে সেটা ভিন্ন কেস। ব্যাতিক্রম তো থাকেই, থাকবেই। সেটা তো প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানব সমাজে বিদ্যামান। আইন করার উদ্দেশ্য খারাপ কিছুকে উষকে দেয়া নয় বরং ভাল কিছুর অনুশীলন করা।

-যে কোন ধরনের মানসিক চাপ প্রায়োগ

ব্যাখ্যাঃ নারী প্রকৃতির এমন একটি উপাদান যাকে জোর জবরদস্তি করে ঠিক উলটো ফল পাওয়া যায়। তাই বুদ্ধিমান, সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত ও রুচিশীল মানুষ কখনো শারীরীকভাবে দূর্বল বলে নারীকে জোর করতে পারে না। তাই যে কোন চাপ তা শারীরীক ই হোক কিংবা মানসিক ই হোক তা নীন্দনীয়।

পারিবারিক নির্যাতন আমাদের দেশে একটি ভয়াবহ সমস্যা। জাতিসংঘের জরিপ অনুযায়ী, এদেশের ৬৭ ভাগ নারী নিজ স্বামী বা আপনজন কর্তৃক ধর্ষণের স্বীকার হন। শুধু ধর্ষণ নয়, একজন নারীকে প্রচুর মানসিক ও শারীরীক চাপ সহ্য করতে হয়। এই যখন সামাজিক পরিস্থিতি, সে সমাজকে বদলানোর জন্য অবশ্যই এমন আইনের দরকার আছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL