নিজের প্যাশন বনাম বাবা-মায়ের স্বপ্ন এবং আমরা যেভাবে মেরুদণ্ডহীন হই

সন্তানের ১৮ বছর বয়সের পরও এদেশের বাবা মায়েরা সন্তানকে খাবার, বাসস্থান, সখ আহ্লাদ, উচ্চশিক্ষা ইত্যাদি দিয়ে যায়। তারা মনে করে এটাই ভালবাসা, বিনিময়ে তারা চায় সন্তান তাদের কথা শুনুক এবং তাদের মুখ উজ্জ্বল করুক। কিন্তু আসলেও কি এটা ভালবাসা? I don’t think so.

এই বাবা-মায়েরা কিন্তু সন্তানের মনের কথা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বোঝেনা, বুঝতেও চায়না। বরং সন্তানের সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিত্ব কোনকিছুতেই তাদের ভরসা নেই। ফলে সন্তান তার নিজের পছন্দের কেরিয়ার বা মানুষকে বেছে নিতে পারেনা, বেছে নিতে হয় বাবা মায়ের পছন্দে। কারণ বাবা মা তাকে ফ্রি ফ্রি অনেক কিছু দিয়েছে। নৈতিকতা ও কৃতজ্ঞতা বোধের এই ভারী সংস্কৃতির জেরে এদেশের বেশিরভাগ মানুষ কম্প্রোমাইজিং জীবন যাপন করে। একটা মিথ্যে জীবন যাপন করে যেখানে নিজের প্যাশন এর চেয়ে বাকিসব কিছু গুরুত্বপূর্ণ। এবং এভাবে কম্প্রোমাইজ করতে করতে সে অ্যাভারেজ হয়ে যায় এবং কখন নিজের বাবা মায়ের মতই হয়ে যায় সে নিজেও জানেনা। নিজের সন্তানদের উপরও সে একই কর্তৃত্ব ফলাতে থাকে, তাদের ক্লাসরুম থেকে শুরু করে বেডরুমের দায়িত্বও স্বেচ্ছায় বহন করাকে ভালবাসা মনে করতে থাকে। সন্তান তাদের কথা ও সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটালে, তারা তাদের সাথে মানসিক দূরত্ব তৈরি করে শাস্তি দিতে থাকে, অর্থনৈতিক সেসব সুবিধা দেয়াও তখন বন্ধ করে দিতে থাকে অনেক ক্ষেত্রে। তাহলে মানসিক বন্ধনহীন, অবন্ধুত্বসুলভ এই সম্পর্ক আসলে ভালবাসা কি করে হল?

এটাই ভালবাসা, এই চেতনা আসলে আমাদের দারিদ্র পুষ্ট জীবনাভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত। খাওয়া পড়া ও থাকার যে সুবিধা আমাদের ছিলনা, যে বা যাদের কাছ থেকে এসব সুবিধা বিনা পরিশ্রমে পাওয়া যায় বা যারা এগুলো দেয়, তাদেরকেই জীবন দাত্রী হিসেবে গণ্য করার সংস্কৃতি আছে আমাদের। একারণে রাজা, স্বামী ইত্যাদি ব্যাক্তিতবর্গকে আমরা প্রভু বলি। বাবা মায়ের সাথে সম্পর্ক হওয়া উচিত প্রথমত আত্মার ও মানসিক। সে সম্পর্কের দরুন সে নিজের অর্থনৈতিক, সামাজিক জীবনের সাথে বাবা মাকে যুক্ত করে, বাবা মায়েরও সে জীবনে যুক্ত হবার অধিকার থাকে। বাবা মায়ের আশীর্বাদ ও ভালবাসা যেমন সন্তান পায়, সমর্থন ও পাওয়া উচিত, তা সে তাদের পছন্দের কেরিয়ার বা মানুষকে বেছে নিক আর না নিক। কিন্তু সেটা না হয়ে এই প্রভু সংস্কৃতির দরুন সম্পর্কটা দাঁড়ায় চাহিদার, সম্পদ ও সম্পত্তির যেখানে সোশ্যাল স্ট্যাটাস মেইন্টেনই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয় দেখা দেয়।

কিন্তু মানুষ স্বাধীন জীব। স্বাধীনতা ইন্ডিভিজুয়াল লেভেলে না চর্চা করলে, মন প্রাণ খুলে কোন কাজ না করতে পারলে মানুষের বিকাশ ঘটেনা। বাঙ্গালী তাই চিরকাল অবিকশিত থেকে যায়। এজন্যই বিশ্বসভ্যতায় বাঙ্গালীর তেমন বড় কোন অবদান নেই। কারণ, মানুষ তার সর্বোচ্চ দিতে পারে তখনই যখন সে সর্বোচ্চ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং কাছের মানুষজনের ভালবাসা ও সমর্থন পায়।

এই যে প্রভু সংস্কৃতি, এর উল্টোটা যদি করা হয়, কি হবে? এর ফলে অর্থনীতিতে অনেক বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। শিক্ষা সংস্কৃতিতেতো বটেই। ১৮ বছর বয়সের পরে যেহেতু সবাইকে নিজের বিষয় আশয় দেখতে হত পূর্ণ বা আংশিকভাবে, তাহলে কি কি ঘটত দেখা যাক:

– যার যে বিষয়ে আগ্রহ, সে শুধু সে বিষয়েই পড়ত
– কর্মসংস্থান কেন্দ্রিক প্রায়োগিক শিক্ষা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হত
– শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেশন জট কমানো জীবন মরণ সমস্যার মত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যেত, শিক্ষার্থীরা এব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেতন হত।
– শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ তৈরি হতে বাধ্য, বিশেষত খণ্ড কালীন, এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় কমে যেত
– যেকোনো কাজকে ছোট করে দেখার যে সাংস্কৃতিক চর্চা, সেটা আর থাকত না
-মুদ্রাস্ফীতি কমে যেত
– জিনিসপত্রের দাম হাতের নাগালে থাকত
– নিজের কাজ ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হত
– ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতা বেড়ে যেত, মানুষ ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করত না
– অর্থনীতি উদ্যোক্তা কেন্দ্রিক হত, ফলে বেকার সমস্যা কমে যেত
-এখন বিসিএস এর মত পরীক্ষা ও চাকরিগুলোর জন্য যেরকম হাহাকার, তা থাকত না।
-রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আসত
– ঘুষ দুর্নীতি কমে যেত
-পরিবারের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হত। বাবা মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক অনেক ইতিবাচক হত
-জাতির মানসিক স্বাস্থ্য অনেক ভাল থাকত

এনিওয়ে, এখন যে অবস্থা চলছে, সর্বত্র, তাতে খুব সহজেই মনে হয়, মেরুদণ্ডহীন একটি সমাজে আমরা বসবাস করছি। কিন্তু মেরুদণ্ড তো আকাশ থেকে পরে না। ১৮-২৬ পর্যন্ত বাপ মা ভরণ পোষণ দিতে বাধ্য এই চিন্তা এই মেরুদণ্ড তৈরিতে যেমন বাধা সৃষ্টি করে তেমনি, সন্তানকে ভরণপোষণ দেয়া মানেই সে বাপ মায়ের পছন্দের কেরিয়ার নিতে বাধ্য থাকবে, বাপ মায়ের পছন্দের একজনকে বিয়ে করতে বাধ্য থাকবে তাদের সোশ্যাল স্ট্যাটাস অনুযায়ী, এধরণের কাজ ও চিন্তা কোনদিন একজন মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে তৈরি করে না। যেসব মানুষরা এই চর্চার ফসল এরাই এই মেরুদণ্ডহীন সমাজ তৈরি করে যাচ্ছে।

পার্শবর্তী দেশ ভারত এটা নিয়ে ভাবছে। তাই তারা বেকারত্ব, ব্যাক্তি পরাধীনতা, পারিবারিক এই প্রভু সংস্কৃতির বেড়াজাল ভাঙ্গার জন্য প্রায় উঠে পরে লেগেছে। থ্রি ইডিয়টস, সুই ধাগার মত আরও শখানেক আলোচিত অনালোচিত ছবি দেখলেই বুঝবেন, এই আন্দোলন কতদূর সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভারত পৃথিবীর ষষ্ঠ অর্থনীতির দেশ এখন, যদিও তাদের সমস্যা অন্তহীন। কিন্তু পৃথিবীর কোন সমৃদ্ধ দেশ এই প্রভু সংস্কৃতিকে কাঁধে করে শীর্ষে পৌছাতে পারেনা, সুখীও হতে পারেনা।

আজ যারা সরকারী চাকরির বয়স ৩৫ করার জন্য আন্দোলন করছে তারা আসলে এই মেরুদণ্ডহীন সিস্টেমের শিকার। তাদের দোষ দিয়েও যেমন লাভ নেই, আবার এটাও ঠিক বাজে সিস্টেমের পরাকাষ্ঠা ভাংতে হয় তরুণদেরকেই, সেই ভাঙ্গার প্রকৃয়াটা যতই কঠিন হোক।

নিরাপদ, আপাত সুখী ও কৃত্রিম জীবন এর চেয়ে অভিজ্ঞতা পূর্ণ, ব্যর্থ কিন্তু নিজের মত স্বাধীন জীবনও অনেক ভাল, কারণ সেটা বেশি বিকশিত।

এত কথা মনে পরল ন্যাস ডেইলির এই ভিডিওটা দেখে:
https://www.facebook.com/nasdaily/videos/2289797527908194/

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL