মুক্তি -পৃথিবীখ্যাত যুদ্ধজয়ী ৩০ মিনিটের অ্যাখ্যান

আজ চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন একাত্তরের জননী রমা চৌধুরী। রমা চৌধুরীর জীবনটা একটা আস্ত সিনেমা হতে পারে। এই বীর মহিলার সংগ্রাম মুখর জীবন নিয়ে কেউ কোনদিন লেখেনি, স্বাধীনতার ৪০ বছর কেটে যাবার পরেও। রেজা ঘটক নামের একজন ব্লগার ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ২০১৩ সালে তাঁকে নিয়ে লেখেন প্রথম। এরপর আলোড়ন সৃষ্টি হয়। রমা চৌধুরীর মত লাখো নারীর যন্ত্রণাময় গল্পের বিনিময়ে আসলে আজকের এই বাংলাদেশ। এত সংগ্রাম, এত ত্যাগ অথচ এই মহীয়সী বিনয়ী নারী ছিলেন অন্তরালে, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সম্মানহীন থেকে গেছেন জীবনের সিংহ ভাগ সময়। এর কারণ যতটা না তিনি, তাঁর চেয়ে বেশি বোধহয় আমরাই।

বাঙ্গালী জাতি হিসেবে খুব একটা শিক্ষিত এবং কৃতজ্ঞ নয়। তাই স্বভাবতই তার বন্ধু কম। বন্ধু থাকলেও সুবিধাবাদী বন্ধুই বেশি। যেমন ইন্ডিয়া। এনিওয়ে, রমা চৌধুরীর মৃত্যুতে আবেগপ্রবণ হয়ে একটা মুক্তিযুদ্ধের ছবি দেখবো বলে ঠিক করেছিলাম। মূলত খুঁজতে গেছিলাম রমা চৌধুরীর উপর তথ্যচিত্র। কিন্তু সন্তোষজনক কিছু পেলাম না। তাই মুভি খুঁজতে শুরু করলাম। খুঁজতে খুঁজতে এই মুভিটা পেয়ে গেলাম। মাত্র ১৭/১৮ মিনিটের। নাম ‘মুক্তি’। দুঃখজনক হলেও সত্য এটা ইন্ডিয়া নির্মিত ৭১ এর উপর একটি ছবি। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে বলতে হবে ৭১ এ, জেনারেল জ্যাকব এবং তার বাহিনী, মানে সহজ কথায় ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নির্মিত একটি ছবি। তবু দেখতে শুরু করলাম, কেননা, ইন্ডিয়া এ পর্যন্ত প্রায় ডজন খানেক এর উপরে ৭১ এর উপর ছবি বানিয়ে ফেলেছে। এবং প্রতিটিই সত্য ঘটনার উপর নির্মিত, তাদের দাবি অনুযায়ী। তাই ঠিক করেছি সবগুলোর উপরেই রিভিউ লিখবো, যথাসম্ভব নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করবো।

তবে এই স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবিটি দেখার পর আমি মুগ্ধ কয়েকটি কারণে। যারা মনে করেন, ইন্ডিয়া ৭১ এর উপর ছবি বানাচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার জন্য, তাদের জন্য একটি দারুণ জবাব। তাছাড়া, টেকনিক্যাল বা অভিনয়ের চেয়ে ছবির পরিচালক-স্ক্রিপ্ট রাইটারের সত্য উন্মোচনের দিকেই বেশি ঝোঁক ছিল। মিলিন্ড সোমান ও ইয়াশপাল শর্মার অভিনয়ের দাপটে ও বিষয় গুনে পুরো ছবিটাই উপভোগ্য হয়ে ভালভাবে উতরে গেছে। ছবির ভাষা ইংরেজি, তবে ইন্ডিয়ান ইংরেজি বলে বাংলা/হিন্দির মতই সহজে বোধগম্য। এই ছবির কনসেপ্ট হচ্ছে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তে নিয়াজীকে বাধ্য করার ঠিক ৩০ মিনিট আগের ঘটনা। সুনীলের পূর্ব-পশ্চিম উপন্যাসে বিখ্যাত এই ৩০ মিনিট নিয়ে অল্প কিছু কথা আছে। মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রেও আছে। আছে জেনারেল জ্যাকবের নিজের লেখা বই Surrender at Dacca: Birth of a Nation – এ।

জেনারেল জ্যাকব সম্পর্কে একটু বলি। জেনারেল জ্যাকব ছিলেন তৎকালীন(১৯৭১) সময়ে পৃথিবীর সেরা জেনারেলদের একজন, ভারতের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির হয়ে অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছেন। তাঁর সৈনিক জীবনে কোন যুদ্ধে তিনি হারেননি। তার জন্ম কলকাতায়। তার পরিবার ছিল খাটি ইরাকি-ইহুদী পরিবার। ইন্ডিয়াতে পার্সিদের পাশাপাশি ইরাকি ইহুদিরাও একসময় সংখ্যায় কম ছিল না। মাত্র ৪০০ বছর আগে ইরাক থেকে তাঁর পরিবার মাইগ্রেট হয়ে পার্সিদের মত কলকাতায় থিতু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট গণহত্যা তিনি দেখেছেন কাছ থেকে এবং স্বভাবতই গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিজের অবস্থান থেকে সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা এবং তাঁর গণহত্যা বিরোধী অবস্থানের পেছনে বিশ্বযুদ্ধে অর্জিত অভিজ্ঞতার প্রভাব ক্রিয়াশীল ছিল নিঃসন্দেহে।

১৬ই ডিসেম্বর সকালে জেনারেল জ্যাকব পৌঁছান পাকিস্তানী জেনারেল নিয়াজীর ডেরায়। এখনকার বঙ্গভবন ছিল তখন নিয়াজীর দুর্গ। সেখানে জ্যাকব তার বাহিনীসহ ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে আত্মসমর্পণের দলিল নিয়ে পোঁছান। যদিও, ইন্দিরা গান্ধী ও ফিল্ড মার্শাল মানিক শাহ সম্পূর্ণই ধোঁয়াশায় ছিলেন আদৌ জ্যাকব পুরো পরিস্থিতি সামলে বাহিনীসহ ভারতে ফেরত আসতে পারবেন কিনা। দেশের ভেতর ও বাইরে প্রবল টেনশন, যুদ্ধের দামামা বাজছে দেশের চৌ-প্রান্ত। যেকোনো মূল্যে জয়, কিংবা পরাজয়ের দায়, এবং গণহত্যা বন্ধের পাহাড় সমান দায়িত্ব দিয়ে ইন্দিরা ও মানিক পাঠালেন জেনারেল জ্যাকবকে ঢাকায়। জ্যাকব মাথা ঠাণ্ডা রেখে দ্রুত আত্মসমর্পণের জন্য নিয়াজিকে প্রস্তাব করেন। কিন্তু চরম অহংকারী, অর্ধ উন্মাদ, এবং চীন-আমেরিকার সাহায্য পাওয়ার অপেক্ষারত নিয়াজি তার এ প্রস্তাবে ক্ষেপে যান। শত্রুর ডেরায় বসে শত্রুকে আত্মসমর্পণের জন্য মাথা ঠাণ্ডা রেখে বোঝানো, বাহাস করা ইতিহাসের আর কোথাও নেই। কি বলেছিলেন সেদিন জ্যাকব নিয়াজিকে?

টেবিলের উপর আত্মসমর্পণের দলিল রেখে সেটায় স্বাক্ষর করতে বলেছিলেন। ঘাড় ত্যাড়া মাথা মোটা নিয়াজি সাইন করতে অস্বীকৃতি জানালে মাত্র ৩০ মিনিট ভাবার সময় দিয়েছিলেন নিয়াজিকে। ব্যাস!আর কিছুনা।

কিন্তু নিয়াজি-জ্যাকবের কথোপকথনই মূলত আকর্ষণীয় অংশ এ ছবিতে। আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেয়া মাত্র নিয়াজি খুব হাল্কাভাবে বিষয়টা নেন। এক পর্যায়ে নিয়াজি তাঁকে রেগে গিয়ে বের হয়ে যেতে বলেন। কিন্তু জ্যাকব কোন ভাবান্তর না দেখিয়ে বসে থাকেন এবং ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলতে শুরু করেন। কয়েকটি অসাধারণ ও নাভোলা ডায়ালগ ছিল এরকম:

জ্যাকবঃ দশ থেকে বারো দিন মাত্র নিয়াজি। That’s how much longer you can fight. আমরা জানি তোমাদের কয়জন সেনা এখানে আছে, তোমরা কোথায় কোথায় আছো। তোমাদের কি পরিমাণ অস্ত্র আছে। আমাদের গুপ্তচররা তোমাদের সব তথ্যই আমাদের দিয়েছে। এবং এসব জানার পর এটা খুবই সরল অংকের মত সহজ যে তোমরা ১০-১২ দিনের বেশি এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেনা। চীনারা তোমাদের বাচাতে আসবেনা। করাচী বন্দর আমাদের নৌসেনারা অবরুদ্ধ করে রেখেছে। আকাশপথ ও অবরুদ্ধ আমাদের আকাশ বাহিনীর দ্বারা। কোথাও থেকে তোমরা কোন সাহায্য পাবেনা। এবং মুক্তিবাহিনী এগিয়ে আসছে তোমাদের দিকে। মাখন যেভাবে গরম ছুড়ি দিয়ে কাটে, তারাও তোমাদের গলা সেভাবে কাটার অপেক্ষায় আছে। তোমাদের কোন উপায় নেই।

নিয়াজিঃ সালো, কুত্তা, ধোকেবাজি অর দাগাবাজি করকে জিত্তে হো তুম হামেশা হামেশা

জ্যাকবঃ বো ক্যায়সে?

নিয়াজিঃ হু ক্রিয়েট মুক্তিবাহিনী? হু ট্রেইন্ড দেম? হাতিয়ার কিসনে দিয়া উনকো? অর যো ইহা যো সিভিল ওয়ার হো রাহা হে, বিকজ অফ ইউ ব্লাডি, ইউ!

জ্যাকবঃ অ্যাগেইন নিয়াজি, ইট ইজ নট ইস্ট পাকিস্তান। অ্যান্ড হাউ ডেয়ার ইউ অ্যাকিউজ অফ ক্রিয়েটিং মুক্তিবাহিনী? হু ক্রিয়েটেড দ্যা রাজাকারস? হু এক্সিকিউটেড অপারেশন সার্চ লাইট? হু মার্ডারড থ্রি মিলিয়ন বেংগালি অ্যান্ড রেপড দেয়ার উইমেন। নোহ, উই ডিড নট ক্রিয়েট মুক্তিযোদ্ধা, ইউ ডিড।

এর বেশি কিছু আর বলতে চাইনা। পুরোটাই ব্রেইন গেইম ছিল। জ্যাকব বলেছেন, তিনি শুধু সত্যটাই বলেছিলেন নিয়াজিকে। নিয়াজি যদি আত্মসমর্পন না করেন, তাঁর অল্টার ইগোর জন্য প্রতিষোধপরায়ন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পুরো বাহিনীসহ কতটা নৃশংসভাবে নিহত হতে পারে, সে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। তবে এটা সত্য ছিল যে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা ততদিনে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এবং পাকিস্তানীরা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পরার চেয়ে ভারতীয় সেনার সামনাসামনি পরলেই বেশি নিরাপদ বোধ করত। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পরলে জীবন বাচানোর কোন সম্ভাবনাই থাকতোনা।

সব শেষে জ্যাকব নিয়াজিকে এই কথাও দিয়েছিলেন যে তিনি নিয়াজি ও তাঁর বাহিনীকে ইউএন ম্যান্ডেট অনুযায়ী ট্রিট করবেন। নিয়াজি অসহায় চিত্তে শেষ বারের মত জ্যাকবকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান প্রাইভেটলি করতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু জ্যাকব সেটা রাখেননি। ফলে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আত্মসমর্পণ এর ঘটনা ঘটে ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্সে। ৯২ হাজার সৈনিক এর একসাথে অস্ত্র সমর্পণ এর আগে কখনই পৃথিবীতে ঘটেনি।

ছবির লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=6bGdIAf2J_k

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL