ইন্দিরা গান্ধী’র নন্দিত ও নিন্দিত জীবনের সেরা দশ বাঁক

আমি ব্যক্তিপূজায় বিশ্বাস করিনা। শ্রদ্ধা করতে ভয় পাই আজকাল, করিনা বললেই চলে। কারণ, অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির কর্মকাণ্ড আমাকে চোখের সামনে পাহাড় ধ্বসের অনুভূতি দিয়েছে। কিন্তু কাউকে কাউকে শ্রদ্ধা করতে বাধ্য হই, মানুষ হিসেবে। যেকজন মানুষের জন্মের কারণে পৃথিবী অনেক সুন্দর এখনও, তার মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী আছেন বলে মনে করি। ছোট বেলা থেকেই উনাকে দেখে আমার এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়। উনাকে ভালবাসার প্রথম কারণ হল, উনি আমার মায়ের মত দেখতে। তাই তাঁকে টিভি স্ক্রিন বা পত্রিকার পাতা যেখানেই দেখতাম, সঙ্গে সঙ্গে মা’র দিকে তাকাতাম।

এনিওয়ে, আমার মনে হয়, এই মহিলার সম্পর্কে আমরা শুধু মুক্তিযুদ্ধে অবদান সংক্রান্ত ঘটনাবলী ছাড়া বিশেষ কিছু জানিনা। তাই এই নন্দিত এবং নিন্দিত মহীয়সীর জন্য একটু নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ইচ্ছা পোষণ করছি।

১। ইন্দিরা গান্ধীর কোন বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি নেই। ১৯৩৪ সালে মেট্রিকুলেশনের পর বিশ্বভারতীতে পড়তে পাঠানো হয় তাঁকে, সেখানে ১ বছর পড়াশোনার পরে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে তাঁর প্রতি। যদিও রবীন্দ্রনাথ তাঁকে খুব ভালবাসতেন, আদর করে নাম দিয়েছিলেন প্রিয়দর্শিনী। কিন্তু অভিযোগ ওঠায় বাবা নেহেরু তাঁকে পড়তে পাঠান লন্ডনের অক্সফোর্ডে। সেখানে তাঁর বিষয় ছিল ইতিহাস, কিন্তু মেজর বিষয় ল্যাটিনে তিনি ফেল করে বসেন ফাইনাল পরীক্ষায়। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনা অসমাপ্ত থেকে যায়। পরে ২০১০ সালে অক্সফোর্ড তাঁকে অনারারি ডিগ্রি দিয়েছিল। শুধু তাই না, ১০ জন সেরা অক্সফোর্ডিয়ানের তালিকায়ও নাম ওঠে তাঁর।

২। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তুঙ্গ সময়ে, নেহেরু নিজের বাসার সমস্ত ব্রিটিশ ও বিদেশী পণ্য পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন, শুধু কন্যা ইন্দিরার জন্য বিদেশ থেকে আনা পুতুলগুলো বাদে। কিন্তু মাত্র ৫ বছর বয়সী ইন্দিরা নিজের পুতুলগুলো পোড়ানোর সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছিল, কেননা সেগুলোও ইংল্যান্ড থেকে আনা ছিল।

৩। মাত্র ১২ বছর বয়সে নিজের স্কুলে ‘বানর সেনা’ বা Monkey Brigrade নামে একটি ছোট্ট গোপন সংগঠন তৈরি করেন। পরে মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে সেই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০,০০০ । এই শিশু ও কিশোর কর্মীদের কাজ ছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ছোট ছোট পতাকা, খাম তৈরি করা, তথ্য পৌঁছে দেয়া (কারণ শিশুদের পুলিশ আটকাতো না) ইত্যাদি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল সে। কংগ্রেসের অহিংস আন্দোলনের সবচেয়ে বড় মিছিল ও লং মার্চের নথি, চিঠিপত্র ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল স্কুল পড়ুয়া ইন্দিরা। কেননা পুলিশ স্কুলগোয়ং বালিকার গাড়ি চেক করবেনা, এটা সে ভালো করেই জানতো।

৪। ‘গান্ধী’ টাইটেল ইন্দিরার জন্মগত নয়। তাঁর নাম ছিল, ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরু। ফিরোজ কে বিয়ে করার পর তাদের দুজনকেই বাধ্য হয়ে গান্ধী পদবী নিতে হয়। ফিরোজ ছিলেন একজন পার্সি। অহিন্দু ফিরোজের সাথে বিদেশে পড়তে গিয়ে প্রেম হয় ইন্দিরার। প্রবল বর্নবাদী হিন্দু একটি দেশে নেহেরুর মত গুরুত্বপূর্ণ একজন দেশনেতার কন্যা হয়ে অহিন্দু একটি ছেলেকে বিয়ের সিদ্ধান্ত এবং সেটা করে ওঠা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। এবং ঘটনাটা ঘটালেন ১৯৪২ এর সেই আগুন সময়ে যখন ইন্ডিয়া ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হবার সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, সর্বত্র সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ও বিভেদের অল্প বিস্তর ডামাডোল বাজছে। লন্ডনে থাকতেই টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, তিনি ফিরোজকে ভালবাসেন এবং বিয়ে করতে চান, কিন্তু নেহেরু সাফ জানিয়ে দেন, এ বিয়ে মেনে নেয়া ধর্মীয় কারণে কোনভাবেই সম্ভব না। যদিও ফিরোজ কংগ্রেসের অসাধারণ একজন সক্রিয় কর্মী ও নেহেরুরই হাতে গড়া একজন ছিলেন। কিন্তু ইন্দিরাও ঘাড় ত্যাড়া। সে ফিরোজকেই বিয়ে করবেন, এবং করেও ফেলেন নিজেদের মত। কিন্তু এই বিয়ে যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রদায়িক বিভেদে আগুনে ঘৃতাহুতির মত হয়ে যাচ্ছে, তখন বাধ্য হয়ে মহাত্মা গান্ধিকে নাক গলাতে হয়। তিনি নেহেরুকে বোঝান এবং সেই সাথে সকল পত্র-পত্রিকার সম্পাদক-সাংবাদিক, নিজের পার্টির কর্মী, দেশের সকল বুদ্ধিজীবী সবাইকে আহবান জানান বিয়েতে আশীর্বাদ করতে। গান্ধীজীর কথায় নেহেরু উভয়কে দেশে ফিরতে নির্দেশ দেন এবং প্রথমে এলাহাবাদে ফিরোজের জরথুস্ত্র ধর্মমতে ও পরে হিন্দুমতে তাঁদের আবার বিয়ে দিয়ে দেন। নেহেরুর শর্ত অনুযায়ী বিয়ের পর ইন্দিরা ও ফিরোজ দুজনেই গান্ধী পদবী ধারণ করেন এবং মহাত্মা গান্ধীর আশীর্বাদ নেন।

৫। প্রধানমন্ত্রী হবার অনেক আগে থেকেই কংগ্রেসের সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর বর্ণাঢ্য কেরিয়ার শুরু হয়েছিল। ১৯৫৯ সালে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। একই সময়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর অন্যতম রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করতেন। ১৯৬০ সালে স্বামী ফিরোজ গান্ধী এমপি নির্বাচনের সমস্তরকম ক্যাম্পেইনের শীর্ষ দায়িত্বে ছিলেন, ১৯৬৪ সালে তিনি জাতীয় নির্বাচনে এমপি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং নির্বাচিতও হন। তাঁকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন তখনকার প্রধানমত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। স্বাধীনতা উত্তর কংগ্রেসে প্রচার কাজ, যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় মোটামুটি রোল মডেল হিসেবে নিজেকে তৈরি করে ফেলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী হবার আগেই। লাল বাহাদুরের মৃত্যুর পর তিনি অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনে অংশ নেন, এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিপুল ভোটে জিতে যান, কারণ ততদিনে তিনি পার্টিতে ও সাধারণের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।

৬। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ইন্দিরা পরবর্তীতে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি বা তাঁর ইন্ডিয়া যদি বাংলাদেশের মানুষকে ১৯৭১ এ সহযোগিতা নাও করত, তবু, যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানই জয়লাভ করতো। কিন্তু এতে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার, উভয় দেশের মানুষকে কয়েকগুণ জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হত, যা দুই দেশকেই কয়েক দশক পিছিয়ে দিত। ভারত-পাকিস্তান অবধারিতভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত সমগ্র সীমান্ত জুড়ে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে ছিল, গরিবি হটাও। তাই তিনি যেকোনভাবে বড় ধরণের যুদ্ধ ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চাচ্ছিলেন, কারণ যুদ্ধ মানেই অর্থনৈতিক ঘাটতি। দ্বিতীয়ত,কোটিখানেক শরণার্থীর বোঝা ইন্ডিয়ার আর্থসামাজিক অবস্থার জন্য হূমকি হয়ে যাচ্ছিল। শরণার্থীরা সারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে যাচ্ছিল, অনেক শরণার্থীর বিচ্ছিন্ন বাদী বাম শক্তিগুলোর সাথে জড়ানোর খবরও পাওয়া যাচ্ছিল নিয়মিত। এ অবস্থায় তাঁর সামনে ছিল দুটি উপায়- শরণার্থীদের সুস্থ অবস্থায় নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা কিংবা ভারতীয় সমাজের মূলধারায় যুক্ত করা। স্বাভাবিকভাবেই তিনি প্রথমটি বেছে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। শরণার্থীদের পরিস্থিতি আরও ভালভাবে উপলুব্ধির পরে তিনি অনুভব করেন, এসবের ঊর্ধ্বে আরও একটি কারণ আছে, আর তা হল গণহত্যা ও অমানবিক বর্বরোচিত অত্যাচার বন্ধ করতেই হবে যেকোনো মূল্যে। এবং এজন্য তিনি বিশ্ব সফর করেন। ১৯৭১ এ বাংলাদেশ জন্মের ঘটনাকে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া তিনি আরও বলেছিলেন, ইন্ডিয়া ঐতিহাসিক কারণে কোনদিনও পূর্ব পাকিস্তানকে দখল করতো না বা ভবিস্যতেও করবেনা। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতু গড়ার মাধ্যমে ঐতিহাসিক মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে দুই দেশ।

৭। ইন্দিরা গান্ধীই সর্বপ্রথম ভারতের সংবিধানে “সমাজতন্ত্র” ও “ধর্ম নিরপেক্ষতা” শব্দ দুটি যুক্ত করেছিলেন। আফসোস এদেশে, মানবতার মায়েদের বসবাস, কিন্তু এই শব্দগুলো সংবিধানে জায়গা পায়না, জনতার মগজেও না।

৮। মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ায় গণ অসন্তোষ বাড়ছিল। এর মধ্যে ১৯৭৭ সালে নির্বাচনে অবৈধ পন্থা অবলম্বনের অভিযোগ ওঠায় উচ্চ আদালত তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি উলটো দেশে “জরুরী অবস্থা” ঘোষণা করে বসেন। ফলশ্রুতিতে প্রায় লাখো রাজনৈতিক কর্মীকে জেলে পোরেন, বিরোধী বুদ্ধিজীবীদের দমন পীড়ন ও বাদ যায়নি। একসময় তিনি নির্বাচন দেন এবং স্বাভাবিকভাবেই পরাজিত হন। মূলত জরুরী অবস্থার শুরুতে এবং অন্তর্বর্তী সময়ে তাঁর দুই পুত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। প্রজ্ঞা বিভক্ত হয়ে স্বৈরতান্ত্রীক চরিত্র নিয়েছিল। বিজেপি ক্ষমতায় এসেও দেশের দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি ও ভয়ংকর বৈষম্য কমাতে পারল না। ফলে গণ অসন্তোষ কমল না। তার উপর এরা ইন্দিরা গান্ধীকে বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগে জেলে পোড়ার পায়তারা করল। ফল হল উলটো। জনতার সহানুভূতি পুরোটাই ইন্দিরার দিকে চলে গেল। দু বছর আগেও যে জনতা ইন্দিরাকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য রাস্তায় পুলিশের গুলি খেতে চাইতো, তারাই আবার তাঁকে বিপুল ভোটে জয়ী করল। বিজেপি সরকারের অদক্ষতা ও অকার্যকারিতাই ইন্দিরার ১৯৮০ সালে বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনে কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

৯। ১৯৮১ সালে একটি শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন যাদের মিশন ছিল স্বাধীন পাঞ্জাব, অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরে অবস্থান করছিল। ইন্দিরার নির্দেশে অপারেশন ব্লু স্টার এর মাধ্যমে ঐ সংগঠনটিকে নিঃশেষ করে সেনাবাহিনী। ঐ অভিযানে অনেক সাধারণ নিরপরাধ মানুষও নিহত হয়। ঐ অপারেশনকে ভারতের রাজনীতির সবচেয়ে
কলঙ্কিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

৯। ১৯৮৪ সালে এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই একজন শিখ তাঁকে হত্যা করে। গোয়েন্দারা তাঁকে সতর্ক করার জন্য তাঁর দেহরক্ষী দল থেকে শিখদের স্থানান্তরের জন্য নথি পাঠালে তিনি সেই নথির উপরে লেখেন, “Arn’t we secular?”

১০। একজন সত্যিকারের রাজনীতিবিদের ভাইস বা ত্রুটি হল অন্ধত্বে। যখন তাঁর দেশপ্রেম কিংবা মানব প্রেম প্রমাণিত, তখন তিনি নিজের নীতি ও সিদ্ধান্ত এক্সিকিউশনে কঠোর হন, কখনও সেটা প্রয়োজনীয় ভাবে, কখনওবা অপ্রয়োজনীয়-ভাবে। ইন্দিরার কঠোরতা কতটুকু প্রয়োজনীয় ছিল সেটা কাল বলে দেবে, যেভাবে বলছে তাঁর ভাল কাজ ও প্রজ্ঞার গল্প। ইন্দিরা গান্ধীকে আজ পর্যন্ত ভারতের সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী এবং জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রায়াত্ব করার মাধ্যমে আধুনিক ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রস্তুতও করেছিলেন তিনি।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL