বাউল নাকি ফাউল!(কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর)

আজকাল ধর্মীয় প্রোপাগান্ডা এত বেশি বেড়েছে যে শেষ পর্যন্ত তার আঁচ বাউলদের উপর ও পড়ছে।

এই বিশিষ্ট ব্যক্তি বাউল ধর্মের উৎস ও ইতিহাস এবং ধর্মটি কতটা ভাল বা মন্দ সে বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন।তিনি বাউল তত্ত্ব নিয়ে যে মত বা রেফারেন্স দিয়েছেন তা ভুল না কিন্তু যারা এসব মতামত দিয়েছে তারা কতটা সঠিক? আসলে সেটা নিয়ে কথা নয়।কথা হচ্ছে তার বিশ্লেষণ নিয়ে।

তিনি বলেছেন,”মূলত: বিকৃত যৌনাচারে অভ্যস্ত ভেকধারী এসব বাউলরা তাদের বিকৃত ও কুৎসিত জীবনাচরণকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখার জন্য বিভিন্ন গানে মোকাম, মঞ্জিল, আল্লাহ, রসুল, আনল হক, আদম-হাওয়া, মুহাম্মদ-খাদিজাসহ বিভিন্ন আরবি পরিভাষা, আরবী হরফ ও বাংলা শব্দ প্রতীকরূপে ইচ্ছাকৃত ভাবেই ব্যবহার করেছে।”

বিকৃত যৌনাচার কি সব বাউলদের মাঝে?নিশ্চয়ই না।যেমন নয় সব হুজুরদের মাঝে।কোন ধর্ম নির্ভুল নয়।তিনি বাউল ধর্মের যে নেতিবাচক দিকগুলো এনেছেন,তার চেয়ে বড় নেতিবাচক দিক আছে ইসলাম ধর্মে।এখানে তো চারজন পর্যন্ত স্ত্রী জায়েজ।সেবিকাকে বা দাসীকেও চাইলে জোর জবরদস্তির মাধ্যমে ব্যাবহারের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

আবার ইসলাম ধর্মের চেয়েও বেশি নেতিবাচক দিক আছে হিন্দু ধর্মে।

আমার কথা হচ্ছে,ধর্মীয় আচার আচরণের ভিন্যতা থাকতেই পারে।যেকোনো ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার ক্ষমতা এবং সহিষ্ণুতা প্রত্যেকের থাকা উচিত।সমস্যা হল এই ব্লগারের মত ইসলাম সেবকরা সেটা পারেনা বলেই ইসলাম এখন বিপন্ন।যার ফল বাউল নির্যাতন এবং তার এই বিষাক্ত পোস্ট। বাউলদের উপর যে বর্বর আক্রমণ হয়েছে সেটা কোনোভাবে কি গ্রহণযোগ্য?এই ব্লগার যেভাবে বাউল ধর্মকে বিশ্লেষন করেছেন তাতে তো বাউল ধর্মকেই নিষিদ্ধ করা উচিত।কিন্তু সেটা গণতন্ত্র নয়।

এবার আসি মূল যুক্তিতে,তিনি বলেছেন,”ইসলাম, ইসলামী আকিদাহ্ যা এদেশের আপামর মুসলিমের অন্তর্নিহিত বিশ্বাসের সাথে বাউল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের দূরতম সম্পর্ক নেই এবং তা পুরোপুরি ষাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয়, বিশ্বাসে পৌত্তলিক, আচার-আচরণে ভয়ঙ্কর কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বিকৃত জীবনাচরণ ও অবাধ যৌনাচারে অভ্যস্ত বাউল সম্প্রদায় কোনভাবেই এদেশের মানুষের কৃষ্টি-কালচার বা আত্মপরিচিতির বন্ধন মূল হতে পারেনা”

কোন ধর্মের আচার আচরণ কতটা খারাপ বা ধ্বংসাত্মক তা নির্ভর করে তা কতটা সমাজকে প্রভাবিত করছে এবং কীভাবে করছে।বাউলরা গাজা ভাং খায় প্রাচীনকাল থেকে সেটা আমরা সবাই জানি,কিন্তু আমাদের যুব সমাজকে মাদকের দিকে ঠেলে দিতে তার ভূমিকা কতটুকু?আর তাদের যে যৌনাচারের কথা বলেছেন,সেটা তাদের সম্প্রদায়ের মাঝে সীমাবদ্ধ বলেই তা সাধারণ্যে অজানা।কোন ধর্মে জীবনাচরণের এই স্বাধীনতা থাকতেই পারে,যেমন আছে পশ্চিমাদের কিংবা আফ্রিকান কোন কোন গোষ্ঠীর মাঝে।সেটা যদি বাউল বহির্ভূত সমাজকে নেতিবাচক ভাবে প্রভাবিত না করে তাহলে সমস্যা কি?এই বিশিষ্ট ব্লগারের মত ইসলাম সেবকদের এত অন্তরজ্বালা কেন বোঝা গেল না।

শরীফ উদ্দিন সবুজ নামক একজন ব্লগারের কাছ থেকে কিছু বিষয় জেনে উপকৃত হলাম।তার বরাদ দিয়ে বলছি,

“বাউলদের সম্পর্কে এটি একটি খণ্ডিত পোষ্ট। নিজেদের বিশ্বাস ধর্ম সম্পর্কিত তথ্য বাউলরা অত্যন্ত যত্ন করে গোপন রাখে। ‌‌’দ্যা ভিঞ্চি কোড’ যারা পড়েছেন বা দেখেছেন বা পড়েছেন তারা এ গোপনীয়তাটি কিছুটা অনুধাবন করতে পারবেন। ভিঞ্চি তার সম্প্রদায়ের কোড লুকিয়ে রেখেছিলেন ছবিতে। বাউলরা লুকিয়ে রাখে তাদের গানে। বাঙ্গালী জাতি যে এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো তার প্রমাণ কি? লিখিত প্রমাণ হচ্ছে দোহা বা চর্যাগীতি বা চর্যাপদ। এ চর্যাপদ কি? চর্যাপদ হচ্ছে বাউলদের সাধন সংকেত। গানের ভেতর লুকিয়ে রাখা তাদের গোপন বার্তা। এক হাজার বছর আগেও বাউল ছিল। আর তাদের গানের ভেতর লুকিয়ে রাখা গোপন লিখিত বার্তাটি-ই বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমাদের প্রাচীনত্বের প্রমাণ। একারণেই বাঙ্গালীর ইতিহাস মানেই বাউলের ইতিহাস।
যৌনাচার সম্পর্কে যেটি এ পোষ্টে বলা হয়েছে সেটি উদ্দেশ্যমূলক। বাউলদের সাধনার চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে নারী বা পুরুষ এর বিচ্ছিন্ন হয়ে স্রষ্টার সাথে মিলে যাওয়া। নারী পুরুষের সম্পর্ক তুচ্ছ করতে না পারলে সাধনার চূড়ান্ত পর্যায়ে যাওয়া যায়না। কে আমরা? কোত্থেকে এসেছি? কোথায় ফিরে যাবো? অতি প্রাচীন এসব প্রশ্ন ভাবুক মাত্রই মনে হাহাকার তৈরি করে। বাউলরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন নিজস্ব পন্থায়। উত্তরও লুকিয়ে রেখেছেন সযত্নে। সাধারণ বাঙ্গালী মুসলমানের সাথে বাউলদের মিল ঐ জায়গায় জীবনের কোন না কোন স্তরে আমাদের মনেও এসব প্রশ্ন হাহাকার তোলে। এ বাংলার প্রকৃতি এজন্য দায়ী। পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষের মধ্যে এসব প্রশ্ন সমানভাবে আলোড়ন তৈরি করে না। যেমন করে আমাদের। এই দার্শনিক বোধ বাঙ্গালী ও বাউলকে একাত্ম করেছে।”

আমার ব্যক্তিগত মত হল,আপাতদৃষ্টিতে অবশ্যই মুসলিম অন্তর্নিহিত বিশ্বাসের সাথে বাউল ধর্ম যায় না এবং তা পুরোটাই সাংঘর্ষিক।কিন্তু তবুও আমরা শত শত বছর ধরে কেন এত বেশি সহানুভূতিশীল তাদের প্রতি,বলতে পারেন?কারণ ঐ যে বলেছেন এদেশের বেশিরভাগ মানুষ পরধর্ম মতে সহনশীল।এবং ঠিক এ কারণেই,অবশ্যই তারা আমার,একজন বাঙ্গালীর আত্মপরিচিতির সাথে সম্পৃক্ত।শত শত বছর ধরে যে বাউল হিন্দু মুসলিম বুদ্ধ খৃস্টান নির্বিশেষে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রকাশ পায় এমন গান গেয়ে যায় বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রামের আনাচে কানাচে এবং বলে”সবার উপর মানুষ সত্য,তাহার উপর নাই”সে অবশ্যই আমার কৃষ্টি-সংস্কৃতি-আত্মপরিচয়ের অংশ।যতই থাক তার সাথে বার কোটি মুসলমানের ধর্মীয় আচরণের অমিল।বরং তার ভূমিকাই আমাদের পরধর্ম মতে সহনশীল হতে সহায়তা করেছে বহুলাংশে।আর যেখানে আসছে দেশের ঐতিহ্য,দেশ,সংস্কৃতি ও কৃষ্টির কথা,মানে বিষয়টা যেহেতু সামগ্রিক তাই ধর্মীয় পরিচয় সেখানে গৌণ।হামিদা হক,কবির চৌধুরীরা বাউল ধর্মের সাথে নয়, কর্ম এবং শত শত বছর ধরে সমাজে তাদের ভূমিকার সাথে বাঙ্গালীর আত্মপরিচয়ের সংযোগের কথাই বলেছেন।

সর্বোপরি,এই ব্লগার বাউল ধর্মের যে জন্ম ইতিহাস তুলে ধরেছেন সেটাই প্রমাণ করে যে তারা কতটা ইতিবাচক,কারণ সেখানে সাম্প্রদায়িক অন্ধত্বের কোন ঠাই নেই,বরং সর্ব ধর্মের মিলন।আর যে নেতিবাচক বিষয়গুলো বলেছেন সেরকম অনেক নেতিবাচক দিক কোন ধর্মে না আছে?

তাই অনুরোধ এভাবে কোন গোষ্ঠীর বিপক্ষে উষ্কানমূলক পোস্ট দিয়ে সাধারণ পাঠককে বিভ্রান্ত করবেননা আর কোন ব্লগার।কেননা ইসলামকে ব্যাবহার করে এভাবে গোস্ঠিগত বিদ্বেষ ছড়ালে তা শুধু বিভ্রান্ত কারীর ধর্মীয় পরিচয়কেই ছোট করবে।সবচেয়ে বড় কথা কারো সাথে আমার মত ও পথের অমিল থাকতেই পারে কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত তা আমার জন্য বা আর কারো জন্য ক্ষতিকর না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাই সর্বোচ্চ মানবিকতা ও গণতন্ত্র।

প্রথম প্রকাশঃ ২৫ শে এপ্রিল, ২০১১ রাত ১০:৪৫

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL