বিদগ্ধ রাজপথ-নগরের ঈদ উৎসব

সকাল ৯টায় বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছলাম। নতুন কোম্পানির চেয়ার কোচের জন্য অপেক্ষমাণ। সকাল যখন সাড়ে দশ, তখন ও টিকিট কাউন্টার কর্তাটি মাখনের মত হেসে…

-“আপা আর মাত্র ১০-১৫ মিনিট লাগবে। এইতো আইয়া পড়ছে। বাস হেমায়েতপুরে। বরগুনাইদ্দা আইতে তো ইট্টু টাইম লাগেই, বোজেন্না, বরিশালদ্যা আয়নায় তো…”

অগত্যা, কি আর করা! ভিড়ের বাজারে দাঁত কিড়মিড় করে বসে থাকা ছাড়া।

অবশেষে ১১ টা বেজে বাসের দেখা মিলল। চেহারা মন্দ নয়। উঠে নিজের সিটের কাছে যেতেই দেখলাম দুই নর-নারী বসে মনের সুখে আলাপ জমিয়েছে। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানালাম যে জানালার পাসের আসনটি আমার। অমনি কোত্থেকে সুপারভাইজার উড়ে এসে হাজির,

-আপা এই সিটটা ওনাগো, আমনেরে বুলে এই সিট দেছে, ওনরা বরগুনাইদ্দা ওঠছে

-তো? এই সিট আমাকে দেয়া হয়েছে, আমি বসব, ওনাদের কোথায় বসাবেন বসান, আমার সিটে আমাকে বসতে দ্যান।

-আচ্ছা আপা, আমনে এট্টু কস্ট করেন, ৫ মিনিট এই সিটে বন আপাতত, দ্যাখতে আছি আমি।

 

অমনি পাশের লোকগুলো সুপারভাইজারের কথায় সায় দিল। আরও পিছনে জানালার পাশের আরেকটি আসন দেখিয়ে সকলে সসম্মানে আমাকে বসিয়ে দিল। আমি ঝামেলা করতে পারতাম। কিন্তু এনার্জি খুঁজে পেলাম না। সেই সুযোগে সুপারভাইজারটিও পগার পার আপাতত। কি আর করা সারা রাস্তা খাবি খাওয়া…

পাশের আসনটিতে বসলেন দেখতে শুনতে একজন খাঁটি গ্রাম্য ভদ্রলোক। একেই মেজাজ খারাপ, এনার্জি লেস, তায় আবার গরম। চুপচাপ ক্ষণ গুজরান করছি। একসময় সহযাত্রীটি জিজ্ঞাসিলেন,

-কই যাইবেন আফা?

-গাবতলি

-কই থাহেন?

আমি চুপ

-কি করেন?

চোখ বন্ধ করে ফেলেছি।

কোন উপায় না দেখে পাশের ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা দ্বয়ের সাথে আলাপ করতে লেগে গেলেন।

-ন্যান আফা, গাব খান। নতুন বাড়ি কিনছি, শিহারপুর। হিন্দুবাড়ি, কাডাল গাছ আর কাডাল গাছ। ১০ হাজার টাহার কাডাল ই বেচছি। গাব ও বেচ্ছি। কেডা খায়।

জানালাম, আমি খাবোনা।সকলকে বিলাতে লাগলেন।

-আছেলাম সি আই ডি’র লোক। আট লাক টাহা ঘুষ খাইছি যহন, চাকরি যায় নায়, ৭ লাখ টাহা খাইলাম যহন, চাকরি গ্যালে।

অবাক হলাম একটু…

-ঘুষ খেলে এখন ও চাকরি যায়?

-যায়।

আইসক্রিম ওয়ালার আগমন। দুই রকম আইসক্রিম। সবুজ ও হলুদ রঙের এক খণ্ড করে বাঁশের ডান্ডীওয়ালা বরফ ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছেনা।

আমি না, মুখ খুললেন পাশের ভদ্রমহিলা দ্বয়ের একজন…

-এহ, আইস্কিরিমের য্যা চেহারা, দুই টাহাইদ্যা কেনলেও লস। কেনো কী হরতে? কিননা খাইস না, মাতায় দে, মাতা ঠাণ্ডা অইবে।

বুদ্ধিটা মন্দ লাগল না। ইস! যদি ঠিক তাই করা যেত এই ঠা ঠা রোদ্দুরে!

সকাল হয়েছে। নাকে তীব্র পচা গন্ধ। চোখ মেলে দেখি এক মধ্যবয়সী নারী, কিন্তু দেখতে কেন যেন থুরথুরে তখনই, সারা গায়ে ঘা আর পচা মাংসের আস্তরণ নিয়ে দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে। ছেড়া খোরা শাড়ি পড়া। চেহারাটা পরিচিত, মা নাকি? চমকে উঠে বুঝতে পেরে চিৎকার করলাম প্রচণ্ড কষ্ট আর ভয়ে। হঠাৎ প্রচণ্ড হর্ন আর ঝাঁকিতে জেগে উঠলাম। গায়ে সার নেই, মুখে আওয়াজ বন্ধ। দেখলাম, গাড়ি ঢাকায় প্রবেশ করছে। ঢাকার গায়ের কিংবা ঘায়ের পঁচা গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ঢাকা আর মা একই। মা যেমন বুড়ো হলেও, রোগে শোকে ভুগে হলেও দাঁড়িয়ে থাকে সর্বাংশে আমাদের গ্রহণ করার জন্য, ঢাকাও তার ক্ষয়ে যাওয়া পচে যাওয়া শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের গ্রহণ করবে বলে, আমরা শুধু নিচ্ছি ই, বিনিময়ে তাকে কি কিছু দিচ্ছি?নাকি কীটের ভূমিকায় নেমে তার ক্ষয়িষ্ণু শরীরের…আরও বলব? হয়ত সহ্য করতে পারবে না কেউ…

বাসে নামার আগে ব্রিজের উপর থেকে পুরো রাতের ঢাকা দেখলাম, লাল নীল সাদা আলো জ্বলছে সারা শহর জুড়ে, নাহ, জেগে আছে, এই শহর কিংবা আমার আপনার মত এখনো কেউ…তাই আশার আলো আজ ও এখন ও জ্বলছে, জ্বলবে..

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL