ছফা – ২

বি.দ্র: এখানে শুধু ছফার বক্তব্য বলা হয়েছে, এই অধমের না। যতটুকু ছফাকে বুঝেছি, সেটুকুই বলেছি। সূত্রঃ ‘বাঙালী মুসলমানের মন’।

ছফার বক্তব্য, ভারতবর্ষের হিন্দুদের মনন জটিলতর। পূর্ববঙ্গে সেটি আবার অদ্ভূত রূপ ধারণ করেছে। মূলত, তারাও এক বইয়ের পাঠক। যদিও তাদের ধর্মগ্রন্থের সংখ্যা মুসলিমদের মত একটি নয়, চারটি। এবং প্রতিটিরই আবার খণ্ড আছে একাধিক। অথচ দেখা যায় শতকরা দুইজনের ঘরেও সবগুলো মূল ধর্মগ্রন্থ নেই, থাকে জনপ্রিয় একখানি বই (গীতা) যেটি নাকি আবার সবচেয়ে পরে লেখা। হিন্দু ধর্মে বিশেষজ্ঞ হওয়া কঠিন। কারণ এত জ্ঞান হজম করা সাধারণের জন্য নিতান্ত অসম্ভব।

পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের পূর্বপুরুষ হল মূলত আর্যরা। এই জল-জঙ্গল ঘেরা ভূখণ্ড নির্বিবাদে দখল করতে পারলেও মানুষের মন জয় করতে তারা মূলত পারে নি। কারণ, এই ভূমির কালো-খাটো-দরিদ্র আদিবাসীদের (মূল বাঙালি) তারা সবসময় তুচ্ছ জ্ঞানই করেছে । পৃথিবীর শুষ্ক অঞ্চল থেকে এসে হঠাত প্রায় নির্বিবাদে পেয়ে যাওয়া এই বাংলার আর্দ্র প্রকৃতির (বাঙলা অঞ্চল) সাথে বহু কষ্টে মানিয়ে নিলেও এখানকার আদিবাসীদের সমান ভাবা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল। ফলশ্রুতিতে তারা রাজশক্তি ব্যাবহার করে। নিজেদের ধর্ম (বৈদিক ও পরে হিন্দু ধর্ম) পালনে বাধ্য করে। বর্ণাশ্রম প্রথা চালু করে সমাজে শৃঙ্খলা আনার নামে শোষণ ও নিষ্পেষণ শুরু করে । এবং সেই থেকে শুরু। লক্ষ লক্ষ এবং একসময় কোটি কোটি নিম্নবর্গীয় বাঙালি হিন্দু নির্যাতিত হতে হতে বিরক্ত হয়ে যায়। তারা নিতান্ত প্রতিশোধ নিতেই দলে দলে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে (শংকরাচার্য, পাল বংশ ও সেন বংশের শেষ সময়কাল)। কিন্তু তাতেও বর্ণাশ্রমের নিষ্পেষণ থেমে না থেকে দিন দিন আরও বাড়তে থাকে। ভীত সন্ত্রস্ত নয়া বৌদ্ধরা যখন ধর্মান্তরিত হয়েও পার পাচ্ছিল না, তখনই চলে আসে মুসলিম শাসন। এবং এই প্রথম হিন্দু-বৌদ্ধ বাঙালি অবলোকন করে তারা রাজশক্তির কাছ থেকে তলোয়ার এর আঘাত এবং ‘জানে পানি’ দুটোই পাচ্ছে। এবং এক সময় তারা শুনতে পেল রাজ প্রতিনিধির কাছ থেকে যে: এই চির বৈষম্য থেকে তারা মুক্তি পাবে। তবে এর মধ্যে ‘যদি’ আছে একটি। আর সেটা হল: তারা যদি সাম্য, মৈত্রী ও ভাতৃত্বের ধর্ম ‘ইসলাম’ গ্রহণ করে। একাধিকবার ধর্মান্তরিত বাঙাল বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বর্ণ-বৈষম্যের নরক থেকে মুক্তি নিয়ে ইসলামকে আঁকড়ে ধরল। মরুভূমিতে নির্বাসিত কোন ক্ষুধার্তের সামনে জল ধরে যদি তাকে পোশাক পরিবর্তনের মত সহজ শর্ত দেয়া হয়, সে কি দ্বিতীয়বার চিন্তা করবে? ইসলাম ছিল ঐ ধর্মান্তরিত হিন্দু-বৌদ্ধদের কাছে তা-ই।

কিন্তু বর্ণপ্রথা থেকে মুক্তি তো মিলল, এরপর? এরপরের ইতিহাস শুধু Identity Crises এ ভোগার ইতিহাস। প্রায় হাজার-খানেক বছরের নির্যাতিত ধর্মান্তরিত মুসলিম paranoid হয়ে পড়ল নিজেরই রচিত অনুকরণের খাঁচায়। সে যুক্তি বুঝতে ভয় পায়। তাই বাংলার সব মুসলিম লেখক-কবির সাহিত্য আবেগে ভরা। কোথাও যুক্তির আধিক্য নেই। সেটা হোক সফলতম কবি নজরুল কিংবা জসীমউদ্দীন। মজার বিষয় হল, যে মুসলিম লেখক-কবির সৃষ্টিতে যুক্তির উপস্থিতি আছে বা বেশি তাকেই কোন না কোনভাবে ‘নাস্তিক’ অ্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। মানে তাকে স্বীকার করা হয়নি মুসলিম সমাজে।

যেসব হিন্দুরা ধর্মান্তরিত হয় নি বা যেসব আর্যরাই নির্যাতকের ভূমিকা থেকে শুধরে প্রগতিশীলতার দিকে হেঁটেছেন তাদের সাথে এরা কোনভাবেই মেধায়, বুদ্ধিতে পেরে উঠতে পারছিল না। পনেরো শতকের পরে হিন্দুইজমে বেশ পরিবর্তন এসেছে। শ্রী চৈতন্যদেবের ভক্তিবাদ ও বৈষ্ণব ধর্ম পাখা মেলেছে। বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন, বিবেকানন্দ, শরত চন্দ্র, বঙ্কিমের মত বাঙালিরা নিজের ধর্মীয় ও সামাজিক মানসে রীতিমত আঘাত করতে থাকেন সবদিক থেকে। এরা শুধু স্ব স্ব ক্ষেত্রেই সফল নয়, রীতিমত সমাজ সংস্কারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকেন। তাদের মনীষা ছিল বেশ যুক্তিনির্ভর। তাই প্রভাব ও কার্যকারিতা বেশি। তারা সমাজ পরিবর্তনে খুব বেশি সফল হতে না পারলেও , বেশ কিছু ধাক্কা দিতে পেরেছিলেন যার ফল ভোগ করেছে সবাই পরে। অন্যদিকে মুসলিম সমাজ শিক্ষা-দীক্ষায় অন্ধকারে সবসময়ই ছিল। তারা কখনই মানিয়ে নেয়ার নীতি নেয় নি হিন্দুদের মত। ফলে শুধু কেবলামুখী শিক্ষা নিয়ে সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকেছে। স্যার সৈয়দ আলী আহমদ , নবাব সলিমুল্লাহ’র মত আগ্রহী কিছু লোক ছিলেন, কিন্তু এরা হিন্দু মনীষীদের মত অতটা ব্যাপকাকারে প্রভাব ফেলতে পারেন নি। তাদের আগ্রহের ভিত্তি ছিল নব্য পরিবর্তিত হিন্দু সমাজ এর সাথে পাল্লা দিয়ে কিছুটা জাতে ওঠার। কৃষিনির্ভর পূর্ব বঙ্গীয় সমাজ এর লুঙ্গী পরা অশিক্ষিত মুসলিমদের নিয়ে তারা খুব বেশি ভাবিত আসলে ছিলেন না।

এদের শিক্ষিত হবার সুযোগ আসতে আসতে ব্রিটিশ শাসন প্রায় শেষ হয়ে এলো। ‘দেশ’ বুঝতে হলে আগে শিক্ষিত হতে হয়। তাই এ ভূমির মুসলিমরা ‘দেশ’, জাতীয়তাবাদ’, বিশ্ব-চেতনা, ‘মানবতাবাদ’ ও সর্বশেষ ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ কী জিনিস সেটা বুঝতে সময় পায় নি। তার আগেই দেশ ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। তারা বুঝল, স্বদেশীরা হল সন্ত্রাসী। পাকিস্তান সমস্যা সামনে চলে এলে বহু কষ্টে জান বাঁচানোর জন্য তারা দেশাত্মবোধ শিখতে বাধ্য হল। কিন্তু পরীক্ষার জন্য পড়া আর ধীরে সুস্থে গবেষণা করে পড়া এক জিনিস নয়। বাঙালি মুসলিম ৭১ এ পরীক্ষায় পাশ করে গেল। কিন্তু দেশ কী, ‘মা’ কী, মানবতাবাদ কী, বিশ্বচেতনা কী, ধর্ম নিরপেক্ষতা কী, এখনও বুঝতে পারছে না। এখনও অতল থৈ বোঝাবুঝির সাগরে। কারণ, সহজ ও স্বাভাবিক শিক্ষাব্যবস্থা এখনও দূর অস্ত। এখনও বর্ণ বৈষম্যের অগোছালো অনুশীলন বাঙালি হিন্দু-মুসলিম সমাজে চলছেই। এখনও নিজেদের মুসলমানিত্ব জাহিরে অনুকরণের প্রতিযোগিতা চলছেই। তাই বাঙালি মুসলিম এখনও ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ থাকছেই। এবং এর ফলশ্রুতিতে বাঙালি মুসলিম সমাজে কোন বড় সমাজ সংস্কারক বা দার্শনিকের জন্ম হয় নি, আজও।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL