শিশুর সামাজিক দক্ষতা বিকাশে অভিভাবকের ভূমিকা

ব্যবস্থাপনাই এখন সবচেয়ে বড় গুণ। সফল হতে হলে ছোটবেলা থেকেই আপনার শিশুকে ভাল ব্যবস্থাপক বানান। আর কিছু লাগবেনা, যেকোন ক্ষেত্রে সাফল্যই পিছু নেবে তার।

যেমন:

সে যখন ভাত খাওয়া শিখবে, তখন থেকেই নিজের মুখ মোছা শেখান।

স্কুলে যাওয়া শুরু করবে যখন, নিজের জুতোর ফিতা বাঁধা শেখান, নিজের জামা পরতে শেখান, বই, খাতা, ব্যাগ, টেবিল গোছাতে শেখান, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন করতে শেখান, প্রাইমেরি লেভেল শেষ করার আগেই শেখান কীভাবে নিজেকে ও নিজের জামা কাপড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। সে স্কুলে যা শিখল তাঁর কাছ থেকে সেটাই আপনি শিখে নিন তাঁর শিক্ষার্থী সেজে। তাঁর মাঝে শিক্ষকসুলভ লিডারশিপ তৈরি হবে। সে শিখেও মজা পাবে এবং মন দিয়ে শিখবে যাতে আপনাকে শেখাতে পারে। তাঁর জন্য আলাদা পড়ার ঘর এবং তার নিজের আলাদা বইয়ের তাক দিন। বছরের শুরুতেই বলুন এটা এ বছরে তাঁর সারা বছরের বই। তাকে ভাল পত্রিকা ও কিশোর ম্যাগাজিন পড়তে দিন। অল্প তবে একটি নির্দিষ্ট সময় টেলিভিশন ও ভিডিও গেম খেলতে দিন। সে বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে আপডেটেড থাকবে এবং ভিডিও গেম মস্তিষ্কের বৃদ্ধি তরান্বিত করবে। মোবাইল ও ট্যাব দূরে রাখুন তবে সেটা যে নিষিদ্ধ বস্তু তা বোঝাবেন না তাকে। দিনের শেষ দুই ঘন্টা দুনিয়া উল্টে গেলেও খেলতে দিন। যে বাচ্চা খেলে না, তাঁর শারিরীক ও মানসিক বিকাশ ভাল মত হয় না। তাই খেলাধূলা বাচ্চার মৌলিক চাহিদা।

হাই স্কুলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাকে থাকার জন্য আলাদা ঘর দিন যার দরজা সবসময় উন্মুক্ত থাকবে অথবা দরজাই থাকবে না, তবু সেটা আলাদা রুম হতে হবে। তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর ঘরে প্রবেশ করবেন না।

তাকে পকেট মানি দিন খুব অল্প পরিমাণ। পকেট মানি জমাতে পারলে এবং কোন ভাল কাজে খরচ করলে তাকে পুরষ্কার দিন।

পড়াশুনায় তাঁর উন্নতি নিজেই যাচাই করুন, প্রশংসা করুন এবং গঠনমূলক সমালোচনা করুন। প্রতিদিন স্কুলে কী হল বন্ধুর মত শুনুন। যতটা সম্ভব সঠিক মতামত দিন যাতে সে আপনাকেই আদর্শ মানে। কারণ, টিনেজারদের একজন আইডল দরকার ঘরে এবং বাইরে। ঘরের আইডল হন। তাঁর সাথে সত্য কথা বলুন যতই তিতা হোক বা অস্বস্তিকর হোক। নিজের এবং আরেকজনের অপরাধ ঢাকবেন না, মনগড়া কথা বলবেন না। যখন বলবেন ঘুষের টাকা হারাম, নিজেও ঘুষ নেয়া থেকে বিরত থাকুন। যখন বলবেন, মিথ্যা বলা পাপ, তাঁর সামনে যাই হোক, মিথ্যা বলবেন না। কারণ, স্ববিরোধী কার্যকলাপ কিশোর বয়সে খুবই বাজে প্রভাব ফেলে যা আজীবন আমাদের সমাজের মানুষরা বহন করে। এবং একারণেই আমাদের সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত। আমাদের সমাজে শেখানো হয় এক, নিজেরা আমরা কাজ করি আরেক । অতএব, এ ধরণের উদাহরণ তাঁর সামনে তৈরি করবেন না।

আপনার কিশোর/কিশোরী সন্তানকে পরিবারের ছোট ছোট দায়িত্ব দিন যেমন, পত্রিকার বিল মেটানো, বয়ঃজ্যেষ্ঠদের ঔষধের সময় মনে করিয়ে দেয়া, তাদের নিয়ে বিকালে হাঁটতে বের হওয়া, তাদের সাথে গল্প করা, তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন তা প্রতিদিন আপনাকে জানানো ইত্যাদি। এতে সে দায়িত্বশীল ও শ্রদ্ধাশীল হবে। এর মাধ্যমে তাঁর মাঝে অভিজ্ঞতাপ্রসূত বিনয় আসবে। ঘরে অতিথি এলে তাদের সংগ দেবার দায়িত্ব দিন যখন আপনি আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকবেন।

তাকে নিজের ধর্মীয় ও সামাজিক আদব-কায়দা শেখান। সহিষ্ণুতা শেখান। একটি সত্যি কথা হল বাংলাদেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ পরিবার থেকেই আমরা সাম্প্রদায়িক কথাবার্তা প্রথম শুনি। আমাদেরই অভিভাবকরা নিজেরা যখন আলোচনা করে আমরা তা শুনি এবং তাদের মত ভাবার অনুকরণ করি অবচেতনেই। যেমন অনেক অভিভাবকরা বলে, হিন্দুরা হল নোংরা, কাফের। ওরা দোজখে যাবে। ওদের বিশ্বাস করা যায় না ইত্যাদি। আবার হিন্দু অভিভাবক বলে, মুসলমান মানেই খারাপ। নারী-গাড়ি-বাড়ি ছাড়া কিছু বোঝেনা, হিংস্র, অন্ধ ইত্যাদি। ওদের কাছ থেকে দূরে থাকাই ভাল ইত্যাদি। এভাবেই আমরা পরিবার থেকে সাম্প্রদায়িকতা শিখি। আপনার সন্তানকে এই কুশিক্ষা দেবেন না। সব ধর্মের ও বর্ণের মানুষের সাথে মিশতে ও সুন্দর আচরণ করতে অনুপ্রাণিত করুন। সুন্দর আচরণ, বিনয়, ধৈর্য, আস্থা স্থাপন, সাহায্য করা ইত্যাদি গুণাবলী অর্জনের সুফল গল্পচ্ছলে নিজের ও পরিচিত মানুষ বা মহামানবদের জীবনের দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝান। অন্য ধর্ম বা ভিন্ন মতের ও গোত্রের মানুষদের শ্রদ্ধা করতে শেখান কিশোর বয়স থেকেই। মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখান। সেই সাথে শেখান নারী-পুরুষের পারস্পারিক সম্মানবোধ ও প্রাইভেসির বিষয়ে।

তাকে ভাল কোন সংগঠনে তালিকাভুক্ত করে দিন যাতে সে একতা ও সংগঠন চর্চা শেখে। কিভাবে সংগঠিত করতে হবে মানুষকে এই শিক্ষাটা খুবই জরুরি। নেতৃত্ব গুণাবলী অর্জনে যেমন সাহায্য করে, তেমনি খারাপ সংসর্গ থেকেও দূরে রাখা যায়। এর ফলে তাঁর মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা থাকবে না বরং সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব তৈরি হবে। সে জীবনমুখী শিক্ষা পাবে।

খেলাধূলা করতে দিন তাকে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে উতসাহিত করুন এবং পারফরম্যান্স যতই খারাপ হোক, প্রশংসা করুন। তাঁর পছন্দ-অপছন্দ গভীরভাবে জানুন। তাকে বেছে নিতে দিন, ভুল করলে বুঝিয়ে বলুন যত কষ্ট হোক মানাতে, ভুলেও গায়ে হাত দেবেন না। যেকোন বড় বড় পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেবার জন্য খাবার টেবিলে সবার মতামত নিন, সাথে তারও নিন ও মনোযোগ দিয়ে শুনু্ন যতই হাস্যকর ও অবাস্তব হোক, যে সিদ্ধান্তই হোক তাকে তা মেনে নিতে শেখান যুক্তি দেখিয়ে। তাহলে সে সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে, তাঁর ব্যক্তিত্ব তৈরি হবে। একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত কেন মোবাইল ও ট্যাব ব্যবহার ঠিক নয়, এর গুরুত্বহীনতা বুঝিয়ে বলুন। এর বদলে খেলাধূলা-সংস্কৃতি চর্চা-বই পড়া প্রবলভাবে মূল্যায়ন করুন। পড়াশুনার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টির প্রতি ঝোঁক বেশি তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। সেই সূত্র ধরে তাঁর সাথে কেরিয়ার প্লান কী হতে পারে তা নিয়মিত আলোচনা করুন। তাকে কখনো আন্ডারএস্টিমেট করবেন না। তবে কেউ যদি তাঁর চেয়ে ভাল করে সেটা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করুন যাতে সেও উৎসাহিত হয়।

কলেজে ওঠার পর তাকে স্টাডি সার্কেল তৈরি করতে উৎসাহিত করুন। তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে বাবা/মা হিসেবে আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন করুন। বিপরীত লিঙ্গের সাথে মিশবে কি মিশবে না সে ব্যপারে বাধ্যবাধকতা দেবেন না। তবে কী কী ক্ষতি হতে পারে অতি কৌতুহলের বশবর্তী হলে সেটা সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিন। লিঙ্গ বিচার না করে বন্ধুত্ব স্থাপনে উতসাহিত করুন। ছেলে বা মেয়ে হোক তাকে রান্নার পাঠ দিন, নিজের খাবার যাতে সে ভবিষ্যতে নিজে তৈরি করতে পারে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে। তাকে মাঝে মাঝে বাজার করতে দিন। ও আরেকটা বিষয় এর মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। আপনাদের কষ্ট বুঝবে সে। তাঁর সামনে সংসারে চালাতে কেমন খরচ হয় বিস্তারিত আলোচনা করুন মাসে একদিন এবং মতামত নিন। তাহলে তাঁর অন্যায় উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি হবেনা। উপরন্তু কিভাবে ভাল থাকা যায় সে ইতিবাচকভাবে ভাবতে শুরু করবে। ১০ বছর পরে কিভাবে সে নিজের পরিবারকে ও সমাজকে প্রভাবিত করবে, কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এই শুভ চিন্তায় তাকে ব্যস্ত রাখুন।

ব্যাস! অভিভাবক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত আপনার দায়িত্ব ক্রমাগতভাবে শুধু এই কাজগুলোই করে যাওয়া।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL