ক্যাম্প এক্স রে – কুখ্যাত গুয়ানতানামোয় ফোঁটা মানবতা নামের ফুল

ছবির নাম ক্যাম্প এক্স রে (Camp X Ray)। মাত্র ১ মিলিয়ন ডলারের ছবি, ব্যবসা করেছে ৬০ মিলিয়ন মানে ১৩৪%। মাত্র ২৫ % নিজের দেশে, বাকিটা সারা বিশ্বজুড়ে। পরিচালনা করেছেন পিটার স্যাটলার (Peter Sattler), এটাই তাঁর প্রথম পরিচালনা। এখন কথা ব্যবসায়ের না শুধু, কথা কন্টেন্ট, ডিরেকশন, অভিনয় এবং মান নিয়ে।

এখন চলছে ‘দেবী’ ঝড়। দেবীর কন্টেন্ট আমরা আগে থেকেই জানি,অনেক ভাল কন্টেন্ট। কন্টেন্ট ভাল থাকলেও পরিচালকরা অনেক সময় নিজের কাজের স্বকীয়তার জন্য কিংবা দর্শকের কথা মাথায় রেখে অনেক কিছু স্যাক্রিফাইস করেন। দেবীতেও সেটা হয়তো থেকে থাকবে, তবে আমাদের দেশের দর্শককে কতটা পরিবর্তন করতে পারবে দেবী সেটা সময় ও প্রশ্ন সাপেক্ষ। এই উপমহাদেশের পরিচালকরা মূলত এ ধরণের অপ্রয়োজনীয় স্যাক্রিফাইজ বেশি করেন।

হলিউডের অনেক পরিচালক কিন্তু ঠিক উলটো। কন্টেন্ট যদি হয় সাহিত্য ঘরানার কিংবা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, তারা কোন স্যাক্রিফাইজ করেন না। দর্শকের কথা মাথায় রেখে তো প্রশ্নই ওঠেনা। মূলত ভাল পরিচালকরা দর্শকের কথা মাথায়ই রাখেন না, তারা দর্শক তৈরি করেন। এত কথা বললাম এজন্যই যে, যে ছবিটি নিয়ে আজ কথা বলতে যাচ্ছি, সেটা দর্শকের কথা মাথায় থাকে পরিচালকের, এরকম টাইপের ছবি নয়। এধরণের ছবিগুলোই দর্শক তৈরি করে, দর্শককে শিক্ষীত করে দর্শক হিসেবেই। ভাল দর্শক-শ্রোতা হওয়াও শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন প্রশ্ন হল, কেন এই স্যাক্রিফাইজ? ব্যাবসা ধরার জন্য? এটা এক নম্বর কারণ, অন্যান্য কারণ এটার পরে আসে। যদি ব্যবসাই ধরতে হবে, তাহলে ভাল কন্টেন্ট সিলেকশনই প্রথম কাজ।

ক্যাম্প এক্স রে ক্রিস্টিন স্টিউয়ার্ডের (Kristen Stewart) করা ছবিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রম ধর্মী ছবি। ছবিটি ২০১৪ সালে মুক্তি পায়। ১১ই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ার হামলার একজন সন্দেহজনক আসামী এবং মার্কিন একজন নারী সেনার মধ্যে ডিটেইনি সেন্টারে গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক মানসিক সম্পর্কের একটি গল্প। হামলার প্রায় আট বছর পরে কুখ্যাত গুয়ানতানামোর ডিটেইনি সেন্টারে নারী সেনা হিসেবে কাজে যোগ দেয় ক্রিস্টিন। সেখানে ক্রিস্টিন মানে এমি’র কাজ হল বন্দীদের পাহাড়া দেয়া এবং দরকারী নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করা। আলী নামে এক বন্দী তাঁর প্রতি আগ্রহী হয়। সে প্রথমে বিরক্ত হয় এবং ঘটনাচক্রে আলীকে শাস্তি পেতে হয়। পরবর্তীতে আলী তাঁর সাথে কথা বার্তা বলার সুযোগ পায়, কিন্তু এমি কিছু বলতে পারেনা, কারণ, নিয়মানুযায়ী বন্দীদের সাথে ব্যক্তিগত কোন তথ্য আদান প্রদান নিষিদ্ধ। এভাবে আলীর পক্ষ থেকে একতরফাভাবে তাদের মাঝে সহজ একটি সম্পর্ক তৈরি হয়। এটা এমির রিপোর্টিং অফিসারের চোখে পরে এবং এমি ও আলী দুজনের সাথেই সে বিরূপ আচরণ করে। সে ইচ্ছা করে এমিকে আলীর স্নান দৃশ্য দেখতে বাধ্য করে। এতে নিয়ম বহির্ভূত আচরণের (A standard operating procedure – SOP) জন্য এমি তাঁর ঐ রিপোর্টিং বসের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। এর আগে ঐ রিপোর্টিং অফিসার তাঁর সাথে যৌন সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল যদিও এতে এমির কিছুটা সম্মতি ছিল। এমির অভিযোগের ফলাফল ভাল হয়নি। এমিকে অন্য সেলে দায়িত্ব স্থানান্তর করা হয়।

ডিটেইনি সেন্টারে সাধারণত সেনারা ১ বছরের জন্য আসে। এমি চলে যাবার ঠিক আগে আবার আলীর সেলে দায়িত্ব নিয়ে আসে। এর মধ্যে এমি আলীর ফাইল ঘেঁটে দেখতে পায়, তাঁর আত্মহত্যা করার প্রবণতা আছে, আলী অনেক শিক্ষিত এবং বই পড়ুয়া গোছের। গুয়ানতানামোর ঐ ডিটেইনি সেন্টারের বন্দীদের আত্মহত্যা করা থেকে বিরত রাখতে তখন সেখানকার প্রশাসন সচেষ্ট ছিল। অনেকদিন পরে এমির দেখা পেয়ে আলী আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। কথার এক পর্যায়ে সে তাঁর কুরআন শরীফে লুকিয়ে রাখা ব্লেড বার করে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়। এমি তাকে বাচাতে নিয়ম ভেঙ্গে নিজের আসল নাম ও সে কোথা থেকে এসেছে বলে। শুধু আলীকে বাঁচানোর জন্যই নয় আসলে, এমি তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পরে। এমির সাথে আলীর এই কনভারসেশনটি প্রায় ১৫ মিনিটের। খুবই মর্মস্পর্শী ডায়ালগ এবং অভিনয়। ক্রিস্টিনের অভিনয় খুবই প্রশংসা পেয়েছে। তবে বিশেষ ভাবে বলতে হয় ইরানীয়ান অভিনেতা Peyman Moaadi এর কথা। এই সুদর্শন ও প্রতিভাবান অভিনেতার অভিনীত “A Separation” ২০১২ সালে বিদেশী ভাষার ক্যাটাগরিতে অস্কার পেয়েছিল। মূলত ক্যাম্প এক্স রে দেখার পর ই “আ সেপারেশন” দেখা হল এই ভদ্রলোকের অভিনয় দেখার জন্য।

শেষ করি আবার কন্টেন্ট দিয়ে। এ ধরণের সাইকোলজিক্যাল জার্নি তৈরি করা ছবি যদি সারা পৃথিবীর দর্শক দেখে হলে গিয়ে, আমাদের দেশের দর্শক কতটা অশিক্ষিত, ভাবলে দুঃখ লাগে। আসলে এদের কাছে সব ছবিই স্লো, ঝুলে যাওয়া, আর্ট ফিল্ম, নাটক টাইপের হবে, এটাই স্বাভাবিক।

ক্যাম্প এক্স রে যদি বাজেটের দেড়শ গুন ব্যবসা করতে পারে, তাহলে একজন শিল্পী (পরিচালক) কেন স্যাক্রিফাইজ করবেন? এই কেন’র ঝড় চলছে সারা বিশ্ব জুড়ে যার ঢেউ এসে লেগেছে বলিউডে। ১০ বছর আগেও যেখানে একটা ছবিতে ১০-১২ টা গান-নাচ থাকতে, এখন সেটা ২-৩ এ এসে পৌঁছেছে। বাস্তবতা আর বিনোদনের একাট্টা করতে এখন সবাই চেষ্টা রত।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL