আয়েশাঃ স্বাধীনতা উত্তর সময়ের অজানা অধ্যায়ের একটি গল্প

স ময় ১৯৭৭। বঙ্গবন্ধু-চার নেতা-তাহের-খালেদ মোশারফ খালেদ মোশারফ হত্যার পরে রাজত্ব চলছে মেজর জিয়ার। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ায় জাসদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। কিন্তু কর্নেল তাহের এর অভ্যুত্থানে আবার যখন পরিস্থিতি কুয়াশাচ্ছন্ন, মেজর জিয়া সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন। জিয়ার সময়ে জাসদই তাঁর সরকারের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, যেহেতু আওয়ামীলীগ তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে। জাসদের কিছু অতি উৎসাহী বিপ্লবী একটি জাপানী বিমান ছিনতাই করে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কাড়তে চেয়েছিল এবং মুখ্যত তাদের লক্ষ্য ছিল সরকারকে বিপ্লবের মেসেজ দেয়া। কিন্তু সে চেষ্টায় তারা ব্যার্থ হয়। তখন জিয়া সরকার গণহারে সংশ্লিষ্ট সৈনিকদের, তারা জাসদ সমর্থন করুক আর না করুক, মার্শাল ল এর আওতায় ফাঁসি দিয়ে দেয় বা গুলি করে। এবং সবচেয়ে মর্মান্তিক হল, এসকল অপরাধী কিংবা নিরপরাধী সৈনিকদের কোন ট্রেসই পরবর্তীতে পাওয়া যায়না। তাদের লাশ কোথায় দাফন করা হয়েছে সেটাও পরিবারগুলোকে জানানো হয়না। এই ট্রাজেডি একটি সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য অনেক হৃদয়বিদারক ছিল। কিন্তু এসব নিয়ে এতকাল কোন চলচিত্র বা নাটক কিংবা গল্প-উপন্যাস-কবিতা লেখা হয়নি। একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এই ৪০ বছরে জমা হয়েছে – কেন?

১৯৭১ ছাড়া আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাবা, পড়াশুনা, ছবি বানানোর চর্চা ইত্যাদি মূলধারার জনতার মধ্যে প্রায় নেই বললেই চলে। যারা চর্চার ঋজু ধারাটি জারি রেখেছেন তারা বামপন্থী রাজনীতির সাথে কিছুটা যুক্ত বা শুভাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু এই শিল্পী ও প্রগতি চক্র থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর জন সাধারণের জন্য চোখে বা মনে তোলার মত কোন কিছু তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছে হয়তো অনেক মঞ্চ নাটক, কিন্তু মঞ্চ নাটকের দর্শক খুবই কম, সাধারণ মানুষের কাছে পৌছায় না তা। আনিসুল হককে ধন্যবাদ যে তিনি ৭১ পরবর্তী সময়, যে সময় নিয়ে খুব কম চর্চা হয়েছে বা মানুষ জানেনা বললেই চলে সেটা নিয়ে লিখেছেন। বাকি যারা লিখেছেন তাদের বিষয়ে দেশের ৯০% পাঠক অন্ধকারে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরের লোকজন সেসব লেখা পড়েনা খুব একটা।

“The Ballad of Ayesha” আনিসুল হক’র এরকম একটি ছোট্ট মাস্টারপিস যেখানে সেসময়কার একজন নিরপরাধ সেনার গল্প উঠে এসেছে। তখনকার ঘোলাটে পরিস্থিতিতে অনেক তাজা নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে গেছে শাসক গোষ্ঠীর উগ্র ও মাথামোটা মানসিকতা এবং তাড়াহুড়ার কারণে। মোস্তফা সরওয়ার ফারুকির অনেকেই সমালোচনা করেন, করতেই পারেন, কিন্তু মাত্র ১ ঘণ্টা ৭ মিনিটের টেলিফিল্মে তাঁর পরিচালনা তাঁর অন্যান্য নাটক-সিনেমার তুলনায় পরিপক্ব মনে হয়েছে। ঐ সময়ের কস্টিউম, ঐ সময়ের বাড়িঘর, যানবাহন, ইভেন মানুষের আচরণ ও ব্যাবহার সবকিছুই সময়কে ধরে নিখুঁত উপস্থাপনা করেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়ে প্রত্যেকের ভেতর থেকে যে অভিনয় বের করে আনার ব্যাপার, সেখানে তিনি অনেক সফল। তিষার অভিনয় বা এক্সপ্রেশন হৃদয় নিংড়ানো। না দেখলে ঠিক বোঝা যাবেনা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহমর্মী ও অসহায় কঠোরতাকে ফ্রেমে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তাতে অস্বীকার্য করার কোন উপায় নেই, এটা পরিচালকেরও গুন।

এই নাটকে আসলে কোন রাজনৈতিক দলকে আক্রমণ করে নয়, সময়কে দেখানো হয়েছে, এখানে মানুষের জীবনের গল্পটিই মুখ্য। নিজেদের ইতিহাসের বা নিজের দেশের মানুষের জীবনের গল্প না জেনে সে বইয়ে হোক বা চলচিত্রে হোক, কিভাবে আমাদের গল্প, আমাদের পরিচালনা, আমাদের চর্চার উন্নতি হবে? আজকের হলিউড বলিউড এই অবস্থানে আসতে প্রায় শত বছর লাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু নিজেদের পলিটিক্যাল-হিস্টোরিক্যাল গল্প বা ঘটনাগুলো নিয়ে নাটক-সিনেমা বানিয়েই তারা আজ এখানে। এখন সারা বিশ্বজুড়ে সব দেশে নিজেদের দেশের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক হিরোদের নিয়ে, সময় নিয়ে নাটক-ডকুমেন্টারি-সিনেমা বানানোর ট্রেন্ড তৈরি হয়েছে। শুধু Entertainment ই যেখানে শেষ কথা নয়। শুধু বিনোদন আসলেই কি শেষ কথা? এখন এটা বড় প্রশ্ন।

আরেকটা বিষয় বলতেই হয়, আজ নিরাপরাধ সেনাদের ট্রাজেডির গল্প দেখছি আর জানছি সময়কে, ইতিহাসকে; আরও ২০-৩০ বছর পরে ২১ আগস্ট নিয়েও নাটক-সিনেমা তৈরি হবে। যেভাবে ‘মাদ্রাজ ক্যাফে’র মত সিনেমা হয়েছে, ‘সরকার’,’ লিংকন’, ‘গান্ধী’ কিংবা ‘রাজনীতি’র মত চলচিত্র নির্মীত হয়েছে। ইতিহাস কাউকে ছেড়ে কথা বলবেনা। মানুষ জানবেই মানুষের পাপ, কষ্ট, ভালবাসা কিংবা ত্যাগের কথা।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL