সবাই সেপিওসেক্সুয়াল হলে পুরুষতান্ত্রীক, ধর্ষক ও নির্যাতক কারা?

মাঝে মাঝে কিছু বিষয় দেখে হাসি পায়, মেজাজও খারাপ লাগে। এই যেমন ধরুণ, এখন ‘সেপিওসেক্সুয়ালিটি’ নিয়ে খুব কথাবার্তা চলছে। অনেকেই নিজেদের ‘সেপিওসেক্সুয়াল’ হিসেবে চিহ্নিত করছে ফেসবুকে। ব্যাপারটা এমন যে, বিষয়টি সম্পর্কে তারা কেবলই জানল এবং সেই জানা অনুযায়ী তারা এক্কেবারে নিশ্চিত যে তারা অবশ্যই সেপিও। হাস্যকর। বিষয়টি সম্পর্কে দু চার লাইন শুনে, গভীরভাবে না বুঝেই কিন্তু তারা এটা করল। যেন এটা করে সেপিও হয়ে তারা জাতে উঠল।

যাইহোক, আমি নিজে আসলে কি, এইটা ভাবি নাই, ভাবতে ইচ্ছাও করছেনা। কেননা উভয়ভাবেই- ফিজিক্যালি আ্যন্ড ইন্টেলেকচুয়ালি মানুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করি বা করেছি। And I don’t care about that- being stuck with a single perspective. তবে প্রথম দেখায় প্রেম/ বিগলিত হবার বিষয়টা আমার আন্ডারস্টান্ডিং ও অভিজ্ঞতার বাইরে, তাই এটা আমার কাছে মিথ, হিন্দী সিনেমার উপাদানের মত। সাইকোলোজিস্টরা বলেন, এটা একটা নিখাদ সাময়ীক শারীরিক আকর্ষণ। এটাকে মহিমান্মীত করে ক্রাশ, প্রথম প্রেম ইত্যাদি নামে ডাকা হয় আর কি। তো এইরকম নিখাদ শারীরিক আকর্ষণ অনেকদিন সেক্সুয়ালি ফ্রাস্ট্রেটেড বা স্টার্ভড থাকার ফলেও হতে পারে। অতএব এটাকে তেমন গুরূত্ব দেবার কিছু নাই।

এই যারা নিজেদের সেপিও বলে শো অফ করছে এখন, আসলে সেপিওদের জীবনের পেইন ও হতাশা নিয়ে এদের নূন্যতম কোন ধারণাই নেই। যারা সেপিওসেক্সুয়াল, তাদের জীবন একই সাথে অনেক আনন্দের আবার অনেক কষ্টের হবেই, অন্যান্য সাধারণদের চেয়ে। বেশিরভাগই পেসিমিস্টিক, স্পর্শকাতর স্বভাবের। এদের মুড হ্যান্ডেল করতে করতেই অনেকের জীবন চলে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা সম্পর্ক নিয়ে কনফিউশন, সাসপিসনে ভোগে। কাউকে ভালো লাগলে অনেক সময় মুখ ফুটে বলতেও পারে না। কাউকে সহসা বিশ্বাসতো করতে পারেইনা, ফলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই অসুখী, হাফ ইনভেনটেড থেকে যায়। ইমোশনালি ইন্টেলিজেন্ট বেশি হলেও জীবনে ভোগান্তি ও হতাশা গভীর। সবচেয়ে বড় কথা, এটা সবসময় কারো কারো জন্য নেচারাল না, কারো কারো জন্য এটা ‘চয়েস’। এবং এই ‘চয়েস’ নির্ভর করে ব্যক্তির শিক্ষা,রুচি,চর্চা, পরিবেশ ও জীবনাচরণের উপর।

আমার ব্যাক্তিগত সহজ ও বেসিক পর্যবেক্ষণ হল, যারা অন্যের ব্যাক্তিগত আবেগ নিয়া হাসি ঠাট্টা করে, অন্যদের বা নিজের সংগীকেই আড়ালে বা প্রকাশ্যে ডিমরালাইজ করে, তারা Insensitive, in a level, এরা সেপিওসেক্সুয়াল না। তাই অনেক সময় এদের কোন একটি বা দুটি বিষয় ভাল লাগলেও বন্ধন তৈরি হয়না এদের সাথে।

আমাদের মত সমাজে গণহারে মানুষজনের নিজেকে সেপিওসেক্সুয়াল হিসেবে দাবী করাটা হাস্যকর ও প্রহসণমূলক। এত সেপিও থাকতে এখানে এখনও এত এত আ্যরেঞ্জ ম্যারেজ, ধর্ষণ কিভাবে হয়, বুঝিনা। পার্কে গিয়ে প্রেম করলে, রাস্তা ঘাটে প্রকাশ্যে ইন্টিমেট হলেই যে সমাজে গেল গেল রব ওঠে সে সমাজে সেপিওসেক্সুয়াল মানুষের উপস্থিতির সম্ভাবনা ০% বা তার চেয়ে কম হবেই। এইসব ছোট ছোট ব্যাপারে মানুষজন লেবুর মত ধর্ম কচলায়, সাইবার ক্রাইম করে, সংগীকে মানসিক নির্যাতন করে, এমনকি মারামারি, খুনাখুনিও করে।

গায়ের রঙ, উচ্চতা, আর্থিক অবস্থা, চাকরি বাকরি এসব শুধু বিয়ের জন্য না,প্রেম করার সময়ও দেখে লোকজন, অবশ্য ওটা কেমন ধারার প্রেম সেটা আমার বোঝার ঊর্ধে। এত সেপিও সমাজে, অথচ ফেয়ার আ্যন্ড লাভলি আর ফেসওয়াশের মত অদরকারী পণ্য কোটি কোটি টাকার ব্যাবসা করে, মেক আপ আর মেক আপ আ্যক্সেসরিজ ছাড়া লোকজন চলতে পারেনা। এর বিপরীতে আবার নারীর পর্দা করার সোশ্যাল চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে, যা অবিধারিতভাবে অবদমিত সমাজ তৈরি করছে।

এসমাজে যদি এত সেপিওই থাকতো, সমাজের মানবিক সম্পর্কগুলো অনেক বিকশিত ও ইতিবাচকভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক হত। কিন্তু গণহারে মেসোজ্যানিস্টিক, সোশ্যালি সাইকোপ্যাথেটিক পুরুষতান্ত্রীক লোকজন নিজেকে সেপিও মনে করতেছে বা সাজতেছে। হায় সেলুকাস!

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL