শ্রেণীকক্ষে উপস্থিত থাকা না থাকা

জাবি উপাচার্য বলেছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকার বিপক্ষে।

ভাবছি এ খবরটা শেয়ার করে একটা স্বীকারোক্তি করব।

হাইস্কুল জীবনে একবার পরপর ৪-৫ দিন স্কুলে যাই নি। স্কুল থেকে বাবাকে ফোন করলেন আমাদের প্রধান শিক্ষক, কেন আমি স্কুলে যাই না, রাস্তায় দেখা হয়েছিল নাকি তাদের, তখনও নাকি অনেক কথা শোনালেন। পরদিন স্কুলে গেলাম, ঘুণাক্ষরেও বুঝিনি আমাকে নিয়ে তাদের এত চিন্তা। পরে জেনেছি আমার বাবা-মা ও শিক্ষকের সাথে আমাকে নিয়ে যত কথা হয়েছে তা শুধু নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কীয়, আমাকে দোষারোপ করে নয়। একটি কিশোর/কিশোরীর মনোদৈহিক ব্যাপারে তারা সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন।

কলেজেও স্বাধীনতা পেয়ে একই ঘটনা ঘটাতাম প্রায়ই। তখন শুধু বাবা-মা বোঝাতো, “কিছু কিছু বিষয় ক্লাস না করে বোঝা যায় না।” আর শিক্ষক বলতেন মন ভেজানো কথা , “তোমরা যদি ক্লাস ফাঁকি দাও, অন্যরাও উৎসাহিত হবে। ক্লাস কর, ক্লাসে তোমাদের দেখতে ভাল লাগে।”

অনার্সে উঠেতো বলা যায় লাগামছাড়া অবস্থা। ক্লাস হত কলেজে নিয়মিত। কিন্ত মাসে ৫-৬ টার বেশি ক্লাস করতাম না। কোন শিক্ষক কোনদিন সেজন্য একটা শব্দও অপচয় করেন নি আমার পিছনে। কিন্তু একদিন, মাস্টার্সের শেষ কয়েকটা দিন ক্লাসে গিয়ে বুঝলাম কত বড় ভুল হয়ে গেছে, কতটা ক্ষতি করে ফেলেছি নিজের। বিষয় যা-ই হোক না কেন, সে বিষয়ে নূন্যতম জ্ঞান অর্জন করতে হলেও আমাদের মত মাঝারি মানের শিক্ষার্থীদের জানেওয়ালা শিক্ষকের কথা শোনা অনেক প্রয়োজন। শেষ কয়েকটা দিন পাশ করার প্রয়োজনে হোক আর ভাললাগার জন্যই হোক শুধু মন্ত্র মুগ্ধের মত ক্লাস করে গেছি আর আফসোস করেছি, কী করলাম আমি পুরো সারে চারটা বছর ক্লাস না করে! এবং এই অলসতার জন্যই হোক আর অস্থিরতার জন্যই হোক, এই কম জানার মাশুল আমাকে দিতে হবে। হয়তো পড়াশুনা করে নিজের মত জোড়াতালি দিয়ে চেষ্টা করে যাবো আজীবন সেই খামতিটা কমানোর। কিন্ত প্রিয় শিক্ষক যেভাবে বোঝাবেন সেভাবে প্রাণবন্তভাবে আর বোঝা হবেনা।

আমার মত আরও লাখো শিক্ষার্থী আছে যারা ভুল করে এবং আফসোস করে। কিন্তু কড়া সিস্টেম এর বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে পারবে না কোনদিন। সময়মত শিক্ষকের সাপোর্ট ও ভালবাসা পেলে নিশ্চিতভাবেই এদের জীবনটা বর্তে যাবে। আমার সৌভাগ্য ক্লাস না করেও অচিন্ত্যনীয় সাপোর্ট শিক্ষাজীবনে সবসময়ই পেয়েছি শিক্ষকদের কাছ থেকে, কোন এক অজানা কারণে। ইভেন সবসময়ই হয়তো পাবো। তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোন সুযোগ কখনও ছাড়ি না।

আজ বিভিন্ন ভাল ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে, স্কুল কলেজে উপস্থিতির বাধ্য বাধকতার নিয়ম চাপিয়ে দিয়ে গলায় সার্টিফিকেটের শিকল পড়ানো হয়। ঐসব নিয়মে পিষ্ট হয়ে মানুষ আর চিন্তাশীল ও সংবেদনশীল থাকছে না। যে কড়া নিয়ম সে মেনে এসেছে, সেটাকেই সমর্থন করে অথবা আরেকজনের উপর চাপায়। ফলে ঝরে যায় অর্ঘ্যরা। আমাদের মত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে না পারার আফসোসকারীর সংখ্যা হয়তো বাড়ে না, কিন্তু শুধু সার্টিফিকেট অর্জনকারীর সংখ্যা বাড়ে। পড়াশুনাকে শিক্ষাজীবনের পরে বিদায় জানানোর সংখ্যা তাই অচিন্ত্যনীয় হারে বাড়ে।

ফেসবুকের মাধ্যমে মন্তব্য করুন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Follow

Get the latest posts delivered to your mailbox:

Free SSL